হেমিংওয়ের যুদ্ধ ও শান্তি

The truth is rarely pure and never simple.”

In matters of grave importance, style, not sincerity, is the vital thing.”

—Oscar wild, The Importance of Being Earnest

এক

আমাদের পৃথিবীতে যে সকল শিল্পী অমর হন, নিজ সময়কালের অনেক অনেক পরের প্রজন্মও যাদের পড়তে থাকে, এঁদের শিল্পের সঙ্গে আমরা ভালবাসি তাদের ব্যক্তিজীবনকে মিলিয়ে পাঠ করতে। কারণগুলো ভেবে দেখেছি। সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে এটিকে : অনেক দূর থেকে যখন আমরা কোন অরণ্যের দিকে তাকাই, দেখি যে বিস্তৃত অরণ্য সবুজ হয়ে আছে—পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী কিংবা সমুদ্র। এ বিপুল বৃক্ষের বিস্তৃত সারি এক মহান প্রাকৃতিক সৃষ্টি, আমরা তা অনুভব করি মূলত এর সমগ্রতা থেকেই। অরণ্যে শুধু শ্বাপদের বসবাস কি থাকে? ফুল, পাখি ও পাতার সঙ্গীতও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেবলমাত্র একটা বৃক্ষের দিকে তাকালে এতটা মহত্বের অধিকার কি আমরা অরণ্যকে দিতাম?

সুতরাং জন্মের ঠিক একশ বছর আঠার পর যখন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রসঙ্গে কিছু লিখতে চাইছি, এবং লোকটা মারা গেছেন আজ থেকে ছাপ্পান্ন বছর আগে, রেখে যাওয়া বিশাল সাহিত্য ভান্ডারের পাশাপাশি মগজে ঢেউ জাগাচ্ছে তার বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি জীবনও। বিশ্ব সাহিত্যের আর যে কোন লেখকের তুলনায় তার জীবন যতটা বর্নাঢ্য, ঠিক ততোটাই যেন ঝোড়ো ও বিষাদময়। মানব সম্প্রদায় সম্পর্কে তার প্রধানতম বক্তব্য ছিল এই যে, “মানুষ নিজেকে ধ্বংস করতে পারে কিন্তু কখনও হারেনা, যতক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকে লড়াই করে যায়।“ কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রধানতম প্রতিপক্ষ কে? কার বিরুদ্ধে লড়ে মানুষ?

দুই

হেমিংওয়ের যখন শুরু, ইউরোপে তখন যুদ্ধের দামামা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

আমেরিকার কানসাস অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় দৈনিক কানসাস সিটি স্টারের একজন তরুণ রিপোর্টার হিসেবে টাইপ রাইটারের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠছে। কিন্তু মাত্র ছয় মাস পরেই রেডক্রসের এম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসেবে তিনি চলে গেলেন ইতালিতে। সেখানে সরাসরি মৃত্যুর সঙ্গে সাক্ষাত ঘটল জীবনে প্রথমবারের মত।

এ তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

মর্টারের আঘাতে ভয়ানক আহত হলেন যুদ্ধে যোগদানের কিছুদিনের মাথায়, সে অবস্থাতেই এম্বুলেন্স চালিয়ে আহত সৈনিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেন হেমিংওয়ে। তার তরুণ শরীরে স্প্লিন্টারের টুকরো-টাকরা আশ্রয় নিতে শুরু করল, একই সঙ্গে হৃদয়েও? দু’পায়ের ভয়ানক যখম তাকে অপারেশনের ছুরির নিচে ফেলল, ছয়মাসের জন্য মিলানে রেডক্রসের হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হল তাকে। তখন মাত্র আঠারো বছর বয়স, সে বয়সে এই প্রথম যৌবনের যুদ্ধস্মৃতি সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, “বালক হিসেবে যুদ্ধে গেলে অমরত্বের ভূতে চাপে, তখন মনে হয় যে সবাই মরলেও আপনি নিশ্চয় বেঁচে থাকবেন.. এরপর যখন বাজেভাবে আহত হবেন, ভুতটা মাথা থেকে নেমে যাবে, আবিষ্কার করবেন যে আর সবার মত আপনিও যে কোন সময় মারা পড়তে পারেন।“

হাসপাতালের এ ছয়মাস বিশ্রামকালীন সময়ে তরুণ হেমিংওয়ের জীবনে আসলেন অ্যাগনেস ফন কুরোস্কি, পেশায় নার্স—তার থেকে সাত বছরের বড় এ নারীর সঙ্গে ছয়মাসের সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল, যুদ্ধ শেষে আমেরিকায় ফেরত যাবার কিছুদিনের মাথায় স্বীদ্ধান্ত নিলেন যে, অ্যাগনেসকেই বিয়ে করবেন। কিন্তু প্রথম যুদ্ধের স্প্লিন্টার যে তার হৃদয়েও বিঁধবে, নইলে চিঠির জবাবে অ্যাগনেস কেন লিখবেন : এক ইতালিয়ান অফিসারের সঙ্গে ঘর বাঁধছি—তুমি নিজের রাস্তা মাপো?

যে উপন্যাস তাকে আধুনিক আমেরিকান সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ১৯২৯ সনে, A farewell to Arms, প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই যে বই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল নিজদেশ ও গোটা ইউরোপেই; এর উপজীব্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই বিচিত্র যাপন, স্মৃতি, প্রেম ও বিষাদ। কিন্তু তার রূপান্তর ছিল ভিন্ন রকম, কারণ উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা একে অন্যকে পেয়েছিল—বিরহ এসেছিল অন্যপথ ধরে।

তিন

এখন ভোর হচ্ছে, অন্ধকার কেটে আলো ফুটছে, শেষ কদিনের মত আজ অবশ্য বৃষ্টি নেই—কাকেরা ডাকছে অনবরত বৈদ্যুতিক তারে ঝুলে ঝুলে। এই এতটুকু বর্ণনা থেকে আমি যদি চলে যাই এমন এক ভোরে রাস্তা ঝাড়ু দিতে থাকা মহিলাটির জীবনে, গ্যারেজ থেকে রিকশা বের করে রাস্তায় নামা রিকশাচালকটির জীবনে—একেকজনের সকাল একেক রকম ভাবে শুরু হয়, লেখক ও মেথরের চিন্তা ও পার্থক্যসমেত কিছু অনুধ্যায়, কোন রকম মতামত বিহীন ও পাঠকের প্রতি সূক্ষ আহ্বানসহ – আসুন, এইসব জীবনে ডুব মারুন, আবিষ্কার করুন বেঁচে থাকার আরও গভীর মানে।

ঠিক এই পদ্ধতি হেমিংওয়ে যখন তার সৃজনশীল সাহিত্যে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন, তা ছিল বিস্ময়কর। পশ্চিমে তখন রচনাকৌশল হিসেবে Stream of conciousness দারুণ জনপ্রিয়, লম্বা লম্বা বাক্য, টানা গদ্য, চেতনের অবারিত প্রবাহ অর্থাৎ একই সঙ্গে চিন্তার উত্থানপতনের ক্রমিক বর্ণনা আধুনিক সাহিত্যে বিপ্লব আনছে। জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ কিংবা মার্সেল প্রুস্ত, আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকা ফ্রানৎস কাফকা এই আধুনিকতার ধ্বজাধারী ছিলেন। এবং হেমিংওয়ের সমসাময়িক উইলিয়াম ফকনারের হাত ধরে আমেরিকান সাহিত্যেও এ ধারার উজ্জ্বল প্রবেশ ঘটছে। কিন্তু হেমিংওয়ের বিশ্বাস ছিল কাহিনীর স্বচ্ছতায়। আপাত চোখে জীবন যে রকম নিস্তরঙ্গ ও সহজ দেখতে, কিন্তু আদতে এর গহন চেহারাটি জটিল, সে ধারাই যেন তার সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছিল।

ছোট ছোট বাক্য ও শক্তিশালী শব্দের ব্যবহারেই বরং দ্রুত নিজের বক্তব্য তুলে ধরা—তার শিল্প কৌশলকে আমেরিকান সমালোচকেরা ব্যাখ্যা করতে থাকেন Iceburg Theory হিসেবে। আর্কটিক অঞ্চলে যে সব বরফের দ্বীপ সমুদ্রে ভাসে, যতটা পানির উপরে দৃশ্যমান হয়—তারচেয়ে সাত-আটগুণ বৃহদাংশ থাকে পানির নিচে, দেখা যায়না। হেমিংওয়ের গল্প-উপন্যাসও এরকম, অতিকথন ছেঁটে শুধু যেন মূল ঘটনা বর্ণনা করে যাওয়া, যার গভীরের বক্তব্য বিশালতার ইশারা দেয়। এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য হালের মার্কিন লেখিকা জেনা ব্লামের এই মতামত –

“Hemingway said that only the tip of the iceberg showed in fiction—your reader will see only what is above the water—but the knowledge that you have about your character that never makes it into the story acts as the bulk of the iceberg. And that is what gives your story weight and gravitas.”

এই রচনাকৌশল তাকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলে, সমালোচকেরা হেমিংওয়েকে আবিষ্কার করেন আমেরিকান সাহিত্যের নতুন কন্ঠস্বর হিসেবে। ভেবে নেয়া যেতে পারে, রচনার এ বিশ্লেষণহীন ও শুধু গল্পপ্রবণ ধারা তৈরিতে লোকটা প্রভাবিত হয়েছিলেন সাংবাদিকতা থেকে, অর্থাৎ সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ভঙ্গি থেকেই এর খুঁটিনাটি আবিষ্কার করেছিলেন তিনি।

চার

জীবনিকার জেফরি মেয়ার্সের Hemingway: A Biography মারফত আমরা জানতে পারছি, অ্যাগনেসের প্রত্যাখ্যান মেনে নেয়াটা সম্ভবত আজীবন তাড়া করে ফিরেছিল তাকে। গোটা জীবনে চারবার বিয়ে করেছেন, এবং প্রত্যেকবারই বিচ্ছেদের সময় স্ত্রীদের আগে ছাড়াছাড়ির পদক্ষেপ তার পক্ষ থেকেই প্রথমে এসেছে। 

পড়তে পড়তে আমার মনে হয় এসব সাজানো গুছানো অনুমান ছাড়া ভিন্ন কী আর? যেন প্রথম প্রেমে ব্যার্থ হলেন আর ঠিক করে নিলেন বাদবাকি যত নারী আসবে তার জীবনে, সবাইকে একে একে ছাড়বেন পরিকল্পনা করে। কিছুটা ছেলেমানুষি কিংবা অবিচার আছে এ মতামতে।

প্রথম স্ত্রী হ্যাডলি রিচার্ডসনের সঙ্গে তার বিয়ে হয় ১৯২১ সনে। স্ত্রী সমেত দেশ ভ্রমনের পরিকল্পনা হিসেবে তারা ঠিক করেন রোমে যাবেন। কিন্তু শেরউড এন্ডারসনের উৎসাহে (শেরউড শুধু হেমিংওয়ে না, ঐ সময়ের অনেক তরুণ আমেরিকান ঔপোন্যাসিকদের কাছে ছিলেন অভিভাবকের মতন) প্যারি চলে আসেন, লেখক হিসেবে তার আসল যাত্রা শুরু হয়। এ সময়টাতেই প্যারিতে ভিড় জমাচ্ছেন গোটা ইউরোপ ও আমেরিকার শিল্পীরা, কেই বা ছিলেন না? সালভাদর দালি, স্কট ফিটজেরাল্ড, জেমস জয়েস, জন দস পাসোস, লুই বুনুয়েল, জন স্টাইনবেক, এজরা পাউন্ড, অল্ডাস হাক্সলি, জেআরআর টলকিয়েন, সিএস লুইস। প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক গারট্রুড স্টাইন এই দশকের শিল্পীদের নাম দেন হারানো প্রজন্ম। হেমিংওয়ে Lost Generation নামটিকে বিখ্যাত করে তোলেন গোটা পশ্চিমা সাহিত্য জগতেই। ১৯২৩ থেকে ১৯২৭, এর মাঝে বেরিয়ে যায় তার Men without women সহ আরও দুটি গল্পসংকলন, তিনটি উপন্যাস যার মাঝে ছিল The Sun Also Rises.  

বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় হ্যাডলি রিচার্ডসন আবিষ্কার করেন, পলিন ফাইফার নামের এক নারীর সঙ্গে প্রেম চালিয়ে যাচ্ছেন হেমিংওয়ে। সুতরাং ১৯২৭ সনে ডিভোর্স হয় তাদের। এবং পলিনের সঙ্গে সম্পর্ক জারি রেখেই হেমিংওয়ে প্রথম প্রেমের দিনগুলিতে ফিরে যান, কেননা এ সময়েই তিনি লিখতে শুরু করেছেন A Farewell to Arms.

পাঁচ

Fiesta, The Sun Also Rises লিখবার আগে হেমিংওয়ে ছিলেন একজন তরুণ ছোটগল্পকার ও সাংবাদিক। ১৯২৫ সনে তার সাক্ষাৎ ঘটে আরেক আমেরিকান লেখক এফ স্কট ফিটজেরাল্ডের সঙ্গে। ও বছরই ফিটজেরাল্ড প্রকাশ করেছেন The Great Gatsby, যে উপন্যাস পরবর্তিকালে হয়ে উঠবে মহান আমেরিকান উপন্যাসগুলোর একটি। ফিটজেরাল্ডের সঙ্গে তার “বন্ধু তুমি, শত্রু তুমি” রকমের সম্পর্ক তৈরি হয়। The Great Gatsby পড়বার পরেই মূলত তিনি সিদ্ধান্ত নেন উপন্যাস লিখবেন।

নিজ অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে হেমিংওয়ে অল্পই লিখেছেন।

The sun also Rises মূলত তাদের হারানো প্রজন্মের গল্পই করে। তিনি নিজে এই প্রজন্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শেরউড এন্ডারসনের পরামর্শে সদ্য বিবাহিত হেমিংওয়ে যে প্যারিতে এসেছিলেন, তার মূল কারণ ছিল এ শহরের শিল্পীসুলভ পরিবেশ আর কম খরুচে সম্মানজনক জীবনধারা।

নিজের প্রথম উপন্যাসে উঠে আসে মূলত তার এ নতুন রকম বেঁচে থাকবার কাহিনী। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধোত্তোর স্বদেশ থেকে নির্বাসিত একদল তরুণ জীবনের অর্থহীনতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েও নানাভাবে তা খুঁজে ফেরে রাত জেগে প্যারির কাফেগুলোতে মদ গিলে, আড্ডা পিটিয়ে, স্পেনে ষাঁড়ের লড়াইয়ের দর্শক হয়ে কিংবা পিরেনিজ অঞ্চলে মাছ ধরবার অভিযান করে। প্রকাশের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেলেও এ উপন্যাস সমগ্র হেমিংওয়ে সাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে। তার রচনাশৈলি প্রতিষ্ঠিত হয় The sun Also Rises’র হাত ধরেই। 

উপন্যাসটি প্রকাশের পিছনে যে কাহিনী, তা অবশ্য দুঃখজনক। যেহেতু আমরা হেমিংওয়ে অরণ্যের সন্ধান পেতে চাই, এ গল্পটা বলে নেয়া জরুরি মনে হচ্ছে।

The Sun Also Rises লিখবার পর তার মনে হয়েছিল যে, আগের বইগুলোর প্রকাশক Boni & Liveright’র সঙ্গে চুক্তিটা কৌশলে শেষ করবেন। চাইছিলেন যে তার প্রথম উপন্যাস বের হোক বিখ্যাত প্রকাশক Scribner’s থেকে। অল্প সময়ের মাঝেই হেমিওয়ে Torrents Of Springs নামে একটি বিদ্রুপাত্মক নভেলা লেখেন—এ কাহিনীর ইঙ্গিত ছিল শেরউড এন্ডারসনকে ব্যাঙ্গ করা। নভেলাটি তিনি Boni & Liveright’র ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলে কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুতই বইটি প্রকাশ করবেনা বলে জানায় কেননা শেরউড ছিলেন এ প্রকাশনির প্রধানতম লেখক। তারা দ্রুতই পূর্বে হেমিংওয়ের সঙ্গে যে তিনটি বই প্রকাশের চুক্তি ছিল তা বাতিল করে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তিনি নিজের প্রথম উপন্যাস প্রকাশ করেন Scribner’s এর সঙ্গে চুক্তি করেই, পরবর্তিকালে আর কখনও প্রকাশক বদল করতে হয়নি হেমিংওয়েকে, এরাই আজীবন তার সকল বই প্রকাশ করে গিয়েছে। আজও করছে। 

ছয়

Hill’s like white elephants নামে তার একটি ছোটগল্প প্রসঙ্গে সমালোচকেরা বলেছিলেন, এ গল্প হেমিংওয়ের লেখকীয় শৈলির উচ্চতরো উদাহরণ, কেননা প্রচলিত ছোটগল্পের ধারাকে ভেঙে মূল চরিত্রগুলোর সংলাপ থেকে তাদের অতীত সম্পর্কে যাবতীয় কাহিনী উদ্ধার করতে হয় স্বয়ং পাঠককেই।

এক স্প্যানিশ রেলওয়ে স্টেশনে কাফেতে বসে ভ্রমণরত দুজন নর-নারীর কিছু সংলাপ ছাড়া এ গল্পের শরীরে যা আচ্ছে, তা হল পরিবেশের নিখুঁত বর্ণনা। নারীটিকে তার পুরুষ সঙ্গী একটা অপারেশন করতে বলে। তা নারীটি করবে কী করবেনা এ নিয়েই আলাপ চলতে থাকে। পুরুষটির সূক্ষ্য কর্তৃত্বপরায়ণ মনভাব ও মেয়েটির ধীরে ধীরে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়া আর পুরুষটিকে চিনে নেবার বিষয়ে আত্মোপলব্ধির ইঙ্গিত আছে গল্পটায়। দুজনের চিন্তাধারার পার্থক্য ও একে অপরকে গুরুত্ব দেবার বিষয়টি ফুটে ওঠে মাত্র কয়েকটি বাক্যালাপে। কিছুদিন আগে আমাদের হাসান আজিজুল হকের ভাষান্তরেও গল্পটি পড়বার সুযোগ হয়েছে, মূলের সঙ্গে দারুণ সামঞ্জস্যময় গল্পটি থেকে এ সংলাপগুলো তুলে দেয়া যেতে পারে :

“মেয়েটি দূরে পাহাড়ের সারির দিকে চেয়েছিল। পাহাড়গুলো রোদে সাদা দেখাচ্ছিল। পুরো অঞ্চলের মাটি ঘন বাদামি আর খুবই শুকনো।

পাহাড়গুলো দেখতে সাদা হাতিদের মতো।

আমি সাদা হাতি একটাও দেখিনি। বিয়ারে চুমুক দিয়ে যুবক বলল।

না তোমার দেখার কথা নয়।

আমিও দেখে থাকতে পারতাম। ঠিক যে কারণে তুমি বললে আমার দেখার কথা নয়- ঠিক এ কারণেই এ কথাটা কিছুই প্রমাণ করেনা।“

কোথাও বলা হয়না যে আমেরিকান যুবকটি তার সঙ্গিনীকে বলছে গর্ভপাত করিয়ে নেবার কথা। এবং মেয়েটি তা করতে অনিচ্ছুক। কিন্তু পাঠকেরা তা অনুমান করে নিতে বেগ পেতে হয়না। যেন এই দুজন নর-নারী তাদের সম্পর্কের নতুন একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, সবকিছু শেষ হবার পরেও একটা নতুন শুরুর সামনে। একটা ঘটনা তাদের জীবনে ঘটতে পারে নাও ঘটতে পারে, তবে জীবন আর আগের মত রইবেনা, অসহিষ্ণু পুরুষটি বুঝতে না পারলেও নারীটি বুঝতে পারে।

হেমিংওয়ের গল্পে এই অননুকরনীয় শৈলি সারাবিশ্বে পরবর্তি কয়েক প্রজন্মের লেখকদের নানান ভাবে অনুপ্রাণিত করে গেছে।

সাত

১৯৩৪ সনে কিনে ফেলা এক ছোট্ট ইয়ট, যাকে হেমিংওয়ে নাম দেন পিলার—পরবর্তি কালে এ জলযান তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তিনি ফ্লোরিডার কিওয়েস্ট থেকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপ পুঞ্জের দিকে যাত্রা করেন পিলারে চড়ে। বাহামার একটি ছোট দ্বীপ বিমিনিতে কিছুদিন বসবাস করেন। এই বসবাসের স্মৃতি থেকেই তিনি লেখেন Island In The Streams, যে উপন্যাস বের হয় তার মৃত্যুর অনেক দিন বাদে। হয়ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পিলার নিয়ে তার যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ইচ্ছে, কিউবান উপকূল ধরে টহল দিয়ে বেড়ানো—সমস্তকিছুই আমেরিকান প্রশাসনের মনে সন্দেহের বীজ ঢুকিয়ে দেয়। ঐ সময়, ১৯৪১ সনে, তিনি চেয়েছিলেন পিলারে চড়ে জার্মান সাবমেরিন ধ্বংস করবেন। যদিও সে ইচ্ছেকে এক রকমের হেমিংওয়ে ফ্যান্টাসী বলেই মনে হয়েছে আমার, যা কখনও পুরণ হয়নি।

কিওয়েস্টে পলিন ফাইফারের সংসারে দু’পুত্র সন্তানের বাবা হেমিংওয়ে এ সময় লেখেন To Have And Have Not, কিন্তু আগুয়ান যে স্পেনের গৃহযুদ্ধ—তা এক অর্থে হেমিংওয়ের এই দ্বিতীয় সংসারেও যুদ্ধের সূচনা করে। ১৯৩৬ সনে তার সঙ্গে পরিচয় হয় সাংবাদিক মার্থা গেলহর্নের।

পরের বছর বন্ধু পরিচালক ইভান ইয়োরিস ও ঔপোন্যাসিক জন দস পাসোসের সঙ্গে হেমিংওয়ে স্পেনে পাড়ি জমান বামপন্থি ও ফ্যাসিবাদ বিরোধিদের সহায়তা করতে, The Spanish Earth নামে একটি প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে থাকেন তারা। ১৯৩৭ সনে মার্থা তাদের সঙ্গে স্পেনের সেই দিনগুলিতে যোগ দেন। তার জীবনে আসা আর সকল নারীর থেকে একদম আলাদা মার্থা গেলহর্ণ’র সঙ্গে দুর্দান্ত প্রেম ঐ সময়ে হেমিংওয়ে কিংবদন্তির মুখরোচক অংশ। মার্থা ছিলেন স্বাধীনচেতা এবং তার আগের স্ত্রীদের মত হেমিংওয়েই তার ধ্যান-জ্ঞান এমন ছিলনা, যেহেতু যুদ্ধ প্রতিবেদকের চাকুরি করতেন, হেমিংওয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হবার পরেও ইউরোপের নানান প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন গেলহর্ণ।

তার উৎসাহেই হেমিংওয়ে লেখেন From Whom The bell Tols, যা হয়ে ওঠে তার অন্যতম জনপ্রিয় ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর একটা।

১৯৪১ সনে তারা চীনে ভ্রমণ করেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির উপরে মার্থা গেলহর্ণের বিশেষ এসাইনমেন্ট উপলক্ষে, হেমিংওয়েও পিএম পত্রিকার জন্য প্রতিবেদন তৈরি করতে থাকেন, যদিও ঐ সময়কার চীন হেমিংওয়েকে ব্যাথিত করে। কিন্তু পরবর্তিকালে গবেষকেরা অনুমান করেছেন, এফবিআই’র সন্দেহের তালিকায় তার নাম প্রবেশের কারণ ছিল এ ভ্রমণ। এফবিআই মনে করত রাশিয়ার ডাবল এজেন্ট হিসেবে তিনি চীনে গিয়েছেন। এরও আগে, স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় হেমিংওয়ে যে প্রোপাগান্ডা সিনেমা বানিয়েছিলেন, তার পিছনেও স্তালিন প্রশাসনের হাত ছিল—এমনতরো অনুমানে এফবিআই দীর্ঘদিন তার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। নোবেল জয়ের পরবর্তি সময়ে একের পর এক দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হেমিংওয়ের নানান দুশ্চিন্তার মাঝে অন্যতম ছিল এই সন্দেহ যে, নিজ দেশের গোয়েন্দা সংস্থা নিত্য চোখে চোখে রাখছে তাকে। ১৯৫৪ সনে পরপর দুবার যে তিনি দুটি বিমান দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান, এ দুর্ঘটনার পিছনেও এফবিআই’র হাত আছে এরকম মনে করতেন তিনি।

আট

 ১৯৫০ সনে Across The River Into The Trees প্রকাশিত হলে বইটাকে সমালোচকেরা খুবই নেতিবাচকভাবে নেয়। ১৫০ এর উপর সমালোচনা, যার অধিকাংশই বইটি ব্যার্থ এরকম বলতে থাকে, হেমিংওয়ে এ সমালোচনায় একদম মুষড়ে পড়েন। তার বয়স বাড়ছিল, সঙ্গে কমছিল যৌবনের সেই প্রচন্ড জীবনবাদি লেখকের অসম্ভব মনের জোর। গেলহর্ণের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছে আরও আগে, তিনি বিয়ে করেছেন চতুর্থবারের মত, ম্যারি ওয়েলশকে। একে একে মারা গেছেন তার লেখক বন্ধুরা, যা শুরু হয়েছিল সেই ১৯৩৯ সন থেকেই, ডব্লিউ বি ইয়েটস, ম্যাডক্স ফোর্ড। ১৯৪০ এ ফিটজেরাল্ড, পরের বছর শেরউড এন্ডারসন ও প্যারির দিনগুলোয় তার সঙ্গে অজস্র মদ্যপ আড্ডার সঙ্গী জেমস জয়েস। এবং ১৯৪৬ সনে মারা যান গারট্রুড স্টাইনও।

যা কোনদিন করেননি, Across The River Into The Trees’র নেতিবাচক সমালোচনায় হেমিংওয়ে তাই করলেন, সমালোচনার প্রতিউত্তরে লিখলেন :

“নিশ্চিতভাবেই তারা বলতে পারে নদীর ওপারে কিছুই ঘটেনি, শুধু যা ঘটেছে নদীর এপারেই এবং নর্ম্যান্ডিতে মিত্রবাহিনীর পদার্পণে, প্যারিস পুনরুদ্ধারে.. সঙ্গে একজন মানুষ যে এক বালিকাকে ভালবেসেছিল এবং মারা গেছিল।“

নেতিবাচক সমালোচনা স্বত্ত্বেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক অবসর প্রাপ্ত কর্ণেলের অতীত জীবনের স্মৃতিচারণ, তার প্রেমের কাহিনী ও বর্তমান দীর্ঘশ্বাসের আখ্যান পাঠকেরা দারুণ ভালবাসায় গ্রহণ করে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বেস্ট সেলার হয় এ উপন্যাস। পরবর্তিকালে গাবরিয়াল গার্সিয়া মার্কেস কিংবা ঐ সময়েই টেনেসি উইলিয়ামের মত আরও অনেকে উপন্যাসটির মহত্ব স্বীকার করেছিলেন।

মার্কেস নিজের এক লেখায় বলেছিলেন, “এটা কেবল তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসই নয়, এটা তাঁর সবচেয়ে ব্যক্তিগত কথনও বটে। এটা তিনি লিখেছিলেন এক অনিশ্চিত শারদীয় সকালে যাপিত জীবনের স্মৃতিকাতরতা থেকে এবং অনাগত কয়েকটি বছরের তীব্র পূর্বানুভূতি নিয়ে। তাঁর আর কোনো বইতেই তিনি নিজের জীবনকে এতোটা গভীরভাবে আনেননি, আর কোনোখানে এতোটা লাবন্যে-ভরা পেলবতাময় চিত্র অঙ্কিত হয়নি যার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর জীবন ও কর্মের অন্তঃরূপকে বিজয়ের উপযোগিতায় প্রকাশ করতে পেয়েছেন। কাহিনির প্রধান চরিত্রের শান্তিময় ও স্বাভাবিক মৃত্যু ছিলো তাঁর নিজেরই আত্মহত্যার পূর্বাভাস!”

নয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫, এ সময়টাতে তিনি কাটান কিউবার উপকূলবর্তি অঞ্চলে, এখানকার জেলে জীবনকে কাছ থেকে অনুভবের অভিজ্ঞতা থেকেই সবচে’ বিখ্যাত উপন্যাস দা ওল্ডম্যান এন্ড দা সি লিখে ফেলেন, যা লাইফ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সনে, একই বছরে বই হিসেবে বেরিয়ে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সমগ্র পশ্চিমে, আগের বইগুলিকেও ছাড়িয়ে যায় এ জনপ্রিয়তা।  হেমিংওয়ে বলেন, সমুদ্রের বিক্ষুব্ধ পরিবেশে জেলে সান্তিয়াগোর এই যে ৮৪ দিন একটা মার্লিনের পিছনে ছোটা, পরাজয়ের আশংকা তুচ্ছ করে শুধু জীবনের জন্য সংগ্রাম—এই কাহিনীই হয়তো তিনি সারা জীবন লিখতে চেয়েছেন, এর চে’ ভাল কিছু লেখা তার পক্ষে সম্ভব না। বইটির জন্য ১৯৫৩’তে হেমিংওয়ে পুলিৎজার প্রাইজ ফর ফিকশন জেতেন, ঠিক পরবর্তি বছরে পান নোবেল সাহিত্য পুরষ্কার।

বিশালাকৃতির মার্লিন শিকারের ঘটনা তার নিজের জীবনেও আছে। বোটে করে মাঝ সমুদ্রে চলে গেছেন, হার্পুনে গেঁথেছেন মাছ, তীরে টেনে যতক্ষণে এনেছেন—সে মাছের অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে হাঙ্গরে—ঠিক যেমনটা হয়েছিল সান্তিয়াগোর ধরা মার্লিনটির ক্ষেত্রেও।

দা ওল্ডম্যান এন্ড দা সি’ই আদতে হেমিংওয়ের শেষ পূর্নাঙ্গ কাজ, জীবদ্দশায় এরপর আর কোন উপন্যাস বের হয়নি, কারণ কী ছিল? জীবনের প্রতি প্রবল তৃষ্ণাক্রান্ত এ মহান লেখকের মনে তখন থেকেই কি অন্যকিছু খেলতে শুরু করেছিল? ঠিক যেমন ঘটেছিল ফকনারের ক্ষেত্রে, শেষ বয়সে এসে আশ্চর্য্য বিনয়ি হয়ে উঠেছিলেন! যদিও ধারণা করা হয় ১৯৫২ সনে পরপর দুবার প্লেন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরবার ধাক্কা তাকে মানসিক ও শারিরিক দু’ভাবেই অসুস্থ করে তোলে, এই ভেঙে পড়বার জের কি তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছিলেন? এমনকি তিনি দীর্ঘদিন এ সন্দেহপ্রবণতায় ডুবেছেন যে, প্লেন দুর্ঘটনা আর নোবেল কমিটির স্বিদ্ধান্তের মাঝে নিশ্চয় কোন সংযোগ আছে—নোবেল জয়ের পরেও সুইডেনের স্টকহোমে সশরীর উপস্থিত কিন্তু হননি বরং নোবেল ভাষণটি লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলনে। যার শুরু ছিল এমন, “লেখালেখির জীবন, নিশ্চিতভাবেই, এক চুড়ান্ত নিঃসঙ্গতার..”

লেখালেখির এই যে উপলব্ধি তার, এ তো ঠিক তার যৌবনের দর্শনের সাথে একেবারে কন্ট্রাডিক্টরি, কিন্তু সত্য এই যে একজন প্রকৃত লেখকের কাছে বিচ্ছিন্ন জীবন বলে কিছু থাকেনা, সাহিত্য তার জীবনে সর্বগ্রাসি হয়ে ওঠে।

৬১ বছরের জীবনে হেমিংওয়ে লেখেন নয়টি উপন্যাস, অজস্র ছোটগল্প ও নন-ফিকশন, চিঠি। সাহিত্য সমালোচনায় বরাবর থাকেন চাঁছাছোলা, অকপট।

তার মানসিক অবসাদের শুরু সম্ভবত ওই ১৯৫২’র বিমান দূর্ঘটনা থেকেই। আর্থিক ও শারীরিক নিরাপত্তা তাকে ভোগায়, মনে করতে থাকেন সিআইয়ে তার উপরে নজর রাখছে গোপনে—কিউবায় আর কখনও ফেরা হয়না, সেখানকার ব্যাংক ভল্টে রয়ে যায় অর্থ ও অসমাপ্ত পান্ডুলিপি।

সমস্ত মিলিয়েই উচ্চমাত্রার দুশ্চিন্তা ও হতাশা তাকে হয়তো ক্লান্তির চুড়ায় নিয়ে যায়। হেমিংওয়ে আত্মহত্যা করেন ১৯৬১ সনের ২ জুলাই, নিজের প্রিয় শটগান মাথায় তাক করে চেপে ধরেন ট্রিগার। তার আইডাহোর পাহাড়ি বাড়িটি যেন আরও রহস্য তৈরি করে, দুপুরটি শোক এবং বিস্ময়ে হয়ে ওঠে হলুদ থেকে হলুদতরো—এক সময়ের প্রচন্ড জীবনবাদি এ লেখকের মৃত্যুও বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে দাঁড়ায় ঠিক তার জন্মের মতই।

[প্রথম প্রকাশ – দৈনিক ভোরের পাতার সাহিত্য সাময়িকী চারুপাতা, ২০১৭]

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন