ওদের কথা

বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে ঘুরে ফিরে আমার দেখা হয় কিংবা কথা হয়।

হয়ত অফিসে যাব সকালে। বাসা থেকে বের হতে দেরি হল। মোড়ের মাথায় দেখব দাঁড়িয়ে আছে কানা নেজাম। ও চোখে দেখেনা। কিন্তু আমি সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কোন এক অজ্ঞাত উপায়ে বুঝে ফেলবে। ডাক দেবে।

আমি বলবো, ‘আজ সময় নাই নেজাম, অফিস ধরতে হবে।’

নেজাম বলবে, ‘অফিস কি হাইটে যাবি? তুই তো মানিব্যাগ না নিয়েই ঘরেত্তে বাইর হইছিস।’

আমি হতাশ হয়ে প্যান্টের পেছনের পকেটে হাত দিয়ে দেখব যে মানিব্যাগ ঠিকঠাক আছে। মেজাজ খারাপ হবে। তখন কানা নেজাম হাসবে। ‘মানিব্যাগ না আনলি কি তোর বিপদ হতি দেতাম? আমাত্থে টাকা নিয়ে অফিস যাতি। আজকে সকালেত্থে ভাল ভিক্কে পাচ্ছি।’

এটুকু বলেই সে নিজের মনে ছড়া কাটবে। আমাকে আর গুরুত্ব দেবেনা।

“যদি জোটে একটি পয়সা

খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি

যদি জোটে এরও অধিক

আমায় ভিক্ষা দিও অনুরাগী”

নেজাম কীভাবে আমার জীবনে জড়িয়ে গেছে, সে কথা আমি বিস্তারিত লিখতে চেষ্টা করছি অনেক দিন হল।

ও ছাড়াও ইমেলে মাঝেমধ্যে আমার সঙ্গে কথা হয় হাঙ্গেরিয়ান এনার্কিস্ট ফিলসফার উনাটুর বিশমিৎ এর সঙ্গে। “রাশোমোন থিওরি” নামে তার একটা স্বল্পখ্যাত কিন্তু শক্তিশালী তত্ত্ব আছে।

উনাটুর ইওরোপিয়ান লোক হলেও প্রাচ্যের দর্শনের প্রতি তার বিগাঢ় ভালবাসা। যদিও আধ্যাত্মিক কোন বিষয়ে তার ভরসা নেই। কোন বিষয়েই নেই।

এক দুর্ভিক্ষের সময় (চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ হবে, কখনও পরিষ্কার করে বলেনা) সে বাংলাদেশে এসেছিল নিজের মিশনারি পিতার সঙ্গে। মিশনারিরা সন্তানের পিতা হয় কীভাবে এই ব্যাপারটা ঘোলাটে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের দিনে তার বাবাও আর্মেনিয়ান চার্চের সামনে ট্রাক চাপায় মারা যান। উনাটুর তখন পনেরো বছরের কিশোর।

হাঙ্গেরিতে ফিরে যেতে খুব কষ্ট করতে হয়েছিল তাকে। ভারতে সে প্রায় সাত-আট বছরের জন্য আঁটকা পড়ে যায়। বিহারের এক গোপন সার্কাস পার্টির নাটিকায় নাকি তাকে বোল্টন নামক কোন নীলকর সাহেবের পাট করতে হত।

যেখানে দেখা যায় সমস্ত নীলকর চাষীরাই নারী। এবং এক রাতে সেই নীলচাষিণীরা বিদ্রোহ করে। বোল্টনরূপী উনাটুরকে সবাই মিলে ধর্ষণ করে তারা।

ওর ব্যক্তিগত কাহিনী বেশিক্ষণ শুনলে কান দিয়ে রক্ত পড়ার দশা হয়। আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখি ইওরোপের দার্শনিক হালহকিকত জানতে। যদিও আমার ধারণা নিজের হালহকিকত ছাড়া আর কিছু সে বলতে চায়না।

উনাটুর বিশমিৎ এর কিছু উক্তি আমি ফেসবুকে মাঝেমধ্যেই শেয়ার করি। আপনারা আমার ফেসবুক প্রোফাইলে গেলেই মাঝেমধ্যে সেসব উক্তি দেখে তার বিস্ময়কর উইটের সন্ধান পাবেন। একটা উদাহরণ দিলেই বুঝবেন, “যারা জেগে উঠছে তারা কখনও ঘুমিয়ে ছিলনা।”

এ ছাড়া আছেন দানেশ, মৈনক, কিংবা তাবিরি। এরা তিনজনেই সম্ভবত একই ব্যক্তি। মৈনক কখনও দানেশ, আর দানেশ কখনও তাবিরি। বাক্যের ধরণ দেখে আমাকে অনুমান করতে হয়।

ইনি বা এনারা অলসতা নিয়ে অবসেসড। আমার ধারণা, রুমি আর শামস তাবরিজির সঙ্গেও এনাদের যোগাযোগ আছে। অলস বলে সামান্যই কথা বলেন বা চিন্তাভাবনা লিপিবদ্ধ করেন, নইলে ওনার নামও সবাই জানত।

আমি নিজেও অলস এ কারণে দানেশ গং এর সঙ্গে আমার ভাল জমে।

অনেকদিন পর পর তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। দানেশ প্রায়ই একটা কথা বলেন, “কিছুই যে করতে ভাল লাগেনা, এইটা কাউকে জানাতেও আলস্য লাগে।” এই এক বাক্য থেকেই আপনারা বুঝবেন কেন প্রচণ্ড জ্ঞানী হওয়া স্বত্বেও উনি জনসংযোগ বিচ্ছিন্ন।

দানেশদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল অসীম সরকার।

সেইবার আমরা বেশ কয়েকজন মিলে উত্তরবঙ্গে গিয়েছিলাম শীতবস্ত্র বিতরণ করতে। দৃশ্যটা আপনাদের বলি। সারা রাত ট্রেনে করে গিয়েছি ঢাকা থেকে। সকালে ট্রেন থেকে পার্বতীপুর নেমে শুনলাম যে ঐদিনই শীত কমে গেছে হঠাৎ করে। মানে প্লাটফর্মে পা দিয়েছি আর ছয়দিনের শৈত্যপ্রবাহ কেটে নাকি রোদ উঠেছে।

কুরিয়ারে করে যদিও কম্বলগুলো আগেই আমরা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওসবের কথা ভেবে হতাশায় আমাদের গরম লাগল খুব। অসীম আগে থেকেই স্টেশনে ছিল স্থানীয় বন্ধু হরকিশোরের বাসায়। আমাদের দেখে অসীম বললো, ‘চিন্তা নিসনা। কাছেই এক গ্রাম আছে। খুব দুরাবস্থা।’

তো, ঐ গ্রামে যাওয়ার পথেই মূলত দানেশদের সঙ্গে আমার সাক্ষাত। একটা বৌদ্ধমঠ লাগোয়া কাঠের ঘরে তিনি বসবাস করছিলেন। আমাদের দেখে উঠে এলেন।

আমি আসলে অনেক দিন ধরেই এদের সঙ্গে আমার টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার কথা লিখে রাখার কথা ভেবেছি। অসীম যদিও বলতো, ‘যত বেশী মিথ্যে কথা লিখবি ততো লোকে বিশ্বাস করবে। কিন্তু সত্য যখন বলবি, লোকে ভাববে কাহিনী বলছিস।’

এই পেজে বিস্তারিত না হলেও, টুকরো টুকরো ভাবে ওদের সবাইকে নিয়েই লিখতে পারি। আগামীতে যদি এসবের কোন মূল্য তৈরি হয়। তবে কখনও সখনও লিখব। আমার অলসতাও তো কিংবদন্তির মতই।

শেষ মেইলে উনাটুর বিশমিৎ জানিয়েছিল, ‘নিজের সাইটে বড় মুখ করে লিখে বেড়ানো কাজের কথা না।’

বললাম, ‘যুগ বদলেছে। তোমরা খাতায় লিখতা, ডায়েরিতে লিখতা, আমরা ওয়েবসাইটে লিখি।’

সে রিপ্লাই দিল, ‘ডায়েরি বা খাতা আমরা হাটে হাটে দেখিয়ে বেড়াতাম নাকি?’

এই প্রশ্নের জবাবে তো আর কিছু বলা যায়না।

জুন ২৭, ২০২০


মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন