কেন বই পড়ি

বই কেন পড়ি আমি?

এই প্রশ্ন অন্যরা যতটা করে আমাকে, তারচেয়ে বেশি নিজেই নিজেকে করি।

এতে কি আনন্দ পাওয়া যায়?

ভ্রমণের, অন্যদের চিন্তার জগতে ঢুকে পড়বার, কল্পনার অসীম প্রান্তরে ঘুরে বেড়াবার আনন্দ?

হ্যাঁ যায়।

বই কি আমাকে জ্ঞানার্জনে সাহায্য করে?

খুব সামান্য। যা পড়ি, তার দশ শতাংশই হয়ত মনে থাকে।

আনন্দ ও জ্ঞান অর্জনের চেয়েও বই সবচেয়ে বড় যে কাজটা করে – সে চিন্তা করতে শেখায়।

কেন বেঁচে আছি, কীভাবে বেঁচে আছি, এসবের উদ্দেশ্যই বা কী, নিজের জীবনে অন্যদের আর অন্যদের জীবনে আমার ভূমিকাটা কেমন – এই নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে শেখায় বই।

জ্ঞান একটা সীমাহীন বস্তু। সেই জ্ঞানের দিকে আমাদের যাত্রাটা চলমান রাখলেই কেবল কিছুটা হয়ত আমরা অর্জন করতে পারি। নিজের আর অন্যদের জীবনে তা কাজে লাগাতে পারি।

আরেকটা প্রশ্ন যা সচরাচর আমি শুনি চিন্তাসক্ষম ও অক্ষম দু’ধরণের মানুষের থেকেই।

ভিজুয়াল মিডিয়ার যুগে বইয়ের গুরুত্ব কি কমে যাচ্ছে বা যাবে?

যখন চাইলেই অনেক বিনোদনমূলক সিনেমা, তথ্যচিত্র, কৌতুক দেখে নেয়া যায়, সময়সাপেক্ষ বই পাঠের গুরুত্ব কি সেসবের চেয়ে কমে যাবে?

উত্তর আসে শব্দ হয়েই।

বই শব্দের ভান্ডার। চিন্তাধারার ভান্ডার।

একটা ভাল ভিডিও বানাতে একগুচ্ছ জমাটবাঁধা শব্দে সাজানো স্ক্রিপ্ট লাগে। লাগবেও। তথ্যচিত্র তৈরি হবেনা লিপিবদ্ধ শব্দের সাহায্য ছাড়া।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলোর জন্ম হয়েছে ও হচ্ছে কারও লেখা গল্প উপন্যাস বা নন-ফিকশন থেকেই।

ভিজুয়াল আর বই মিলে মিশে গেছে, তাই কি বলবো আমি?

না। তা বলতে পারছিনা।

ভিজুয়ালের স্কোপ খুবই সীমিত। ভিডিও দেখতে আপনি ভালবাসেন ঠিকই, কিন্তু তিন থেকে চার ঘন্টার বেশি সময় একটা বিষয়ে আপনি ব্যায় করবেন না।

আপনাকে শার্প স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে হবে। ডিটেলিং কমাতে হবে।

গভীরতার পাশাপাশি আস্থা রাখতে হবে সংক্ষিপ্ততার কৌশলে। ঐ কৌশলে বিনোদন ও প্রাপ্তি যেমন আছে, আছে অনেক ফাঁক ও ফাঁকিরও রিস্ক।

বইয়ে এই ঝুঁকি কম। জ্ঞান যেমন এক চলমান প্রক্রিয়া, একজন লেখক বইয়ের মাধ্যমে এই অসীম জার্নিতে আপনাকে কোন রকম কাটছাঁট ছাড়াই একটা আইডিয়া, দর্শন বা গল্পের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারেন।

সিনেমায় আপনি দেখেন পরিচালকের নির্মিত এমন এক ভুবন, কল্পনার অবকাশ যেখানে বিবিধ কারণেই সীমিত। মানে পরিচালক আপনার কল্পনাকে বহুস্তরে যাওয়ার সম্ভাবনা ছেঁটে ফেলেন দৃশ্যায়নের মাধ্যমে।

আর বই কী করে?

লেখক আপনাকে আহ্বান জানাতে পারেন ঐ বইয়ের পৃথিবীটা নিজের মত ভেবে নিতে (বই চিন্তা করতে শেখায়, আগেই বলেছি)।

ভাল বই থেকে ভাল সিনেমা হয়, কিন্তু বইয়ের প্রত্যাশা সিনেমা কখনই পূরণ করতে পারেনা। বরং সিনেমা একটা প্যারালাল সৌন্দর্য তৈরি করে, যা তার সোর্স ম্যাটেরিয়াল বা ঐ বইটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

এই ব্যাপারটি যে কোন বিখ্যাত এডাপ্টেশনের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকতে দেখবেন।

ধরুন, জর্জ আর আর মার্টিনের হাই ফ্যান্টাসি নভেল ‘আ সং অফ আইস এন্ড ফায়ার’ প্রকাশের পর থেকেই পাঠকপ্রিয় আর বিখ্যাত ছিল। কিন্তু টিভি সিরিজ গেম অব থ্রোনস যখন জনপ্রিয়তা পেল, দেখা গেল আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে বইয়ের বিক্রিও।

এমন কেন হয়? হয়, কারণ ভাল এডাপ্টেশন পাঠকের তৃষ্ণা দেয় বাড়িয়ে।

সেই তৃষ্ণা আর ভিজুয়াল মিডিয়া পূরণ করতে পারেনা এক সময়। মানুষ সোর্স ম্যাটেরিয়ালে ঢুকে কল্পনার আরও বিস্তৃত জগতে আশ্রয় নিতে ভালবাসে।

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন