রূপান্তরের জানালা থেকে কাফকার জীবন

লেখাটি পুরনো। মহামারীর এই বন্দি দিবস-রজনীতে মনে হল আবার পড়া যেতে পারে। দেখবেন যে এই আলাপের বিষয়বস্তু আমাদের বর্তমান যাপনের সঙ্গে কেমন প্রাসঙ্গিক। সম্পাদনা বলতে কিছু অংশ বাহুল্য মনে হওয়ায় ছেঁটে ফেলেছি। চেষ্টা করেছি বানানগুলো ঠিক করতে। আপনারা এই লেখার সঙ্গে সঙ্গে “রূপান্তর” পড়ে নিতে পারেন আরও একবার। গল্পের চেয়ে বড় আশ্রয় কোন কিছুতে নেই। শেষে রইলো ফ্রানৎস কাফকার লেখালেখি প্রসঙ্গে চমৎকার একটা ভিডিও।

বাইরে ঝিঁঝি ডাকছে। এরা মাটির ঢিপিতে দিনভর ঘুমায়। জেগে উঠতে থাকে ঠিক সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে। এখন রাতের দ্বিতীয় প্রহর। হালকা শীতে চারদিকে কেমন ঝিম ধরানো আবেশ। লিখছি ছোট বোনের পড়ার টেবিলে ল্যাপটপ রেখে। আলো নেভানো।

ছুটিতে চন্দনীমহল এসেছি। আজ প্রথম রাত। কিছু পরেই ঘুমিয়ে যাব। কাল সকালে উঠে যদি নিজেকে আবিষ্কার করি একটা ঝিঁঝি হয়ে বিছানায় পড়ে আছি, কেমন হবে?

আম্মা বিছানার চাদর তুলে কি চিৎকার দিয়ে উঠবেন? ছোট বোনেরা ভেবে নেবে ভাই নিশ্চয় বাইরে গেছে, বিছানায় ঘাপটি মেরে থাকা পোকাটিকে ঝাঁটা মেরে তাড়ানো দরকার। আব্বা হয়ত ওদেরকে একটা ঝাড়ু এগিয়ে দেবেন। তারপর খুঁজতে বের হবেন আমাকে।

অস্বীকার করবার কিছু নেই, ফ্রানৎস কাফকার রূপান্তর শেষ করে অনুভূতিটা হল – হুট করে আমি এক সকালে অমন বদলে গেলে?

কয়েক বছর আগের কথায় ফিরি একটু।

ক্ষুধাশিল্পী নামের একটা গল্প পড়ে চমকে উঠেছিলাম। সেবা প্রকাশনীর অনুবাদ (যে ধরণের ভাষান্তরে কাহিনী জীবন্ত থাকলেও মূল লেখকের নিজস্বতা প্রায় অদৃশ্য হয়ে ওঠে)।

গল্পটির প্রধান চরিত্র দিনের পর দিন অনশনে কাটিয়ে দেয়। টিকেট কেটে তাকে লোকজন দেখতে আসে। না খেয়ে থাকার বিশ্বরেকর্ড করতে চাওয়া মানুষটি ভিতরে ভিতরে আমাকে কাঁদিয়ে ছাড়ে।

প্রথম পাঠে কাফকা আপনার মনে দুটি ইচ্ছের জন্ম দিতে পারেন। এক, এই লেখককে আর কখনও পড়বেন না। দুই, মাত্র শেষ করা গল্পটি নিয়ে আপনি গভীর চিন্তায় ডুবে যাবেন এবং সুযোগ মত ওই একই গল্প আবার পড়তে চাইবেন।

মাসরুর আরেফিন অনুদিত কাফকার গল্পসমগ্রটি দুই নম্বর ইচ্ছের কারণেই হস্তগত করেছিলাম। কিন্তু কোন গল্পই শেষ করা হচ্ছিলনা। ব্রেসসায় উড়োজাহাজ দু’পাতা পড়ে চলে যাচ্ছিলাম গীর্জায় আসা রমণীর সঙ্গে কথোপকথনে, নইলে ঢুঁ মারছিলাম এক গ্রাম্য ডাক্তারের উপর।

এই করতে করতে যখন বছর পার হতে থাকলো, নিজেকে শান্তনা দিতাম – হয়নি, এখনও কাফকা পড়ার সময় হয়নি আমার।

আজ অনেক দিন পর হৃদয়ে বেজে উঠলো ঘণ্টা। নিখুঁত সুযোগ সমাগত। আমি কাফকা শুরু করতে পারি আবার। সুতরাং বইটা খুললাম।

প্রথমেই চোখে পড়লো রূপান্তর। পড়বেই, যা দেখেছি, এই গল্পটা বিচারের চেয়েও নামকরা।

রোমান কবি ওভিদের মহাকাব্য মেটামরফোসিস, যেখানে নার্সিসাসের বৃক্ষ হয়ে যাওয়া কিংবা যৌনকাতর জিউস ষাঁড়ের বেশ ধরে মিলিত হচ্ছেন কাঙ্ক্ষিত নারীর সঙ্গে – এরকম চমকপ্রদ রূপান্তরের কাহিনীগুলো আছে। অনুমান করলাম কাফকা তার গল্পের নামকরণে ওভিদ থেকেই উৎসাহ পেয়ে থাকবেন।

আবার এপুলিয়াসের সোনালী গাধা (যার লাতিন অর্থও রূপান্তর) তাকে মুগ্ধ করে থাকবে হয়ত। এই গল্পে (অনেকের মতে পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস) এপুলিয়াসের নায়ক জাদু প্রয়োগ করলো পাখি হবার জন্য কিন্তু ভ্রান্তিজনিত কারণে সে মানুষ থেকে পরিণত হল গাধায়।

কাফকার বড় গল্পটিতে মূল চরিত্র গ্রেগর সামসা এক ভ্রাম্যমান সেলসম্যান। যাকে নিত্যদিন ভোর চারটার ট্রেন ধরতে হয় অফিসের জন্য। কোন এক সকালে ঘুম ভেঙে সে দেখলো চার পেরিয়ে সাত বেজে যাচ্ছে, বিছানায় সে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আকৃতির এক পোকা হয়ে।

একজন মানুষ, যে কিনা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম লোক আর খুব কর্মঠ, জীবন যার কাছে কঠিন হলেও স্বপ্নগুলো মরে যায়নি, মা-বাবা আর সতেরোয় পড়া ছোটবোন গ্রেটিকে নিয়ে মোটামুটি সুখের সংসার – কেনইবা এক সকালে সে পোকা হয়ে গেল?

পুরো বিষয়টিকে সরলার্থে ফ্যান্টাসি বলে মনে হতে পারে। আসলে কি তাই?

গল্পটি এক নিম্নমধ্যবিত্ত জার্মান পরিবারের। যেখানে মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যাবার সম্ভাবনা নেই কারও, নেই জাদুর চেরাগে ঘষা দিয়ে দৈত্য ডেকে আনবার সুযোগ।

যদিও গল্পে অমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়, আর দুটো উদাহরণই রূপকের মহত্ব মন্ডিত।

মার্কেসের উড়তে উড়তে হারিয়ে যাওয়া সুন্দরী রেমেদিওস কিংবা মিলান কুন্ডেরার দেবদূতগণ আমাদের হৃদয়ে বিষণ্ণতা জাগায়, কিন্তু রূপান্তরে পরিষ্কার হয়ে ওঠে কাফকার ফ্যান্টাসি নির্মমতরো, যা বিষণ্ণতার পাশাপাশি ভেঙেচুরে দিতে চায় আমাদের সুস্থিরতার নকশা।

গ্রেগর সামসা অর্থ উপার্জনে হাড়ভাঙ্গা শ্রম দিত সপ্তাহভর। ছুটির দিনগুলোয় পরিবার নিয়ে কোন অবকাশ যাপন কেন্দ্রে চলে যেত। এই স্বাভাবিক চক্রে ভয়ংকর গোলযোগ তৈরি হল তার রূপান্তরে। চেনা পৃথিবীতে যেন সে এক অস্বস্তি। চারপাশ যে নিয়মে চলছে, তার বিরুদ্ধে এক গাঢ় অনিয়ম।

যে পুত্রটি ছাড়া পরিবারের কোন গতি ছিলনা, সবার কাছে সে ছিল উন্নতি ও সমৃদ্ধির জীবন্ত প্রত্যাশা, পোকা হয়ে যাওয়ার পর সকলের চোখে তার অবস্থান বদলে যেতে শুরু করলো।

নিষ্ঠুরতায় এগিয়ে এলেন বাবা। বৃদ্ধ বয়সে আবার উপার্জনে নামতে হবে, ক্লান্ত শরীরটিকে নামাতে হবে পথে – এর সমস্ত দায় তিনি চাপিয়ে দিতে চাইলেন সামসার উপর। তাকে আহত করলেন, এমনকি পারিবারিক যে কোন অঘটনে নিশ্চিত ধরে নিলেন, ওতে হাত (অজস্র পা) আছে তার পোকা হয়ে যাওয়া পুত্রের।

আকস্মিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠবার পর মায়ের মন খারাপ হল, সামসার রুমটিতে মাঝেমধ্যে অসহায় উঁকি দেয়া ছাড়া আর কিছু করার উপায় তার রইলোনা।

দেখা যায় একমাত্র গ্রেটিই সহোদরের প্রতি ভালবাসা ধরে রাখতে সংগ্রাম করছে। তখন আমরা গল্পকারের জবানিতে শুনতে পাচ্ছি – গ্রেটির মিউজিক স্কুলে ভর্তি হবার শখ, চমৎকার বেহালা বাজায়। আসছে ক্রিসমাসেই গ্রেগর ঠিক করেছিল বোনটিকে সেখানে ভর্তি করিয়ে দেবে, যত অর্থই লাগুক না কেন।

ভিতরে ভিতরে তাই গ্রেগর অনুতপ্ত হয়, ভেবে নেয় পরিবারের এ দুর্দশা আর স্বপ্নভঙ্গের জন্য তার অসহনীয় অবয়বটিই দায়ী।

কাফকা রূপান্তর লেখেন, জীবনকে বিদ্ধ করেন নিষ্ঠুরতায়। এর সঙ্গে যোগ হয় এক প্রচ্ছন্ন কৌতুকবোধ, যা তিনি করেছেন ওই নিষ্ঠুরতাকে বুড়ো আঙুল দেখাতেই।

যেমন, দেয়ালের একটি চিরচেনা পোর্ট্রেট সরিয়ে নিতে চায় গ্রেটি, পোকারূপী সামসা লাফিয়ে ছবিটার উপর বসে, ছবিটা ওখান থেকে সরাতে দেবেনা এই তার পণ। এমনকি ভেবে নেয় বেশি বাড়াবাড়ি করলে সে গিয়ে বসে পড়বে বরং বোনের মুখের উপর – চলতে থাকে তার কষ্টসৃষ্ট অথচ হাস্যকর নড়াচড়া।

গল্পটা পড়তে পড়তে এক মুহূর্তও এ চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়না যে, নিশ্চয় যা হচ্ছে তা দুঃস্বপ্ন, ধুপ করে গ্রেগর সামসা ঘুম থেকে জেগে উঠবে একদিন, আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবো, যাক এসব তো এক দুঃস্বপ্নই ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি। ইওরোপ জুড়ে প্রায়ই ফুঁসে উঠছে গাঢ় ইহুদিবিদ্বেষ। তার লেখায় সরাসরি এসবের বর্ণনা মেলেনা।

মুখচোরা লোকটি তখন প্রাগের পথেঘাটে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। বিয়ারের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছেন। নারীসঙ্গে স্বস্তি খুঁজবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাকে শান্তি দিতে পারছে না কোন কিছুই। প্রতিরাতে দেখা দুঃস্বপ্নগুলো তাড়িয়ে ফিরছে। শুধুমাত্র যেন লেখার টেবিলটাই তার নিজস্ব পৃথিবী যেখানে তিনি স্বাধীন। তাই কি?

গল্পটির শব্দগুলো উল্টে দেখলে বুঝতে পারা যায় স্বাধীনতা তিনি পাননি। পিতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিজীবনের দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে সামসা আর তার বাবার মাঝে দৃশ্যমান বৈরিতার মাঝে।

১৯১২ সালের নভেম্বরে ফ্রানৎস কাফকা গল্পটা লিখেছিলেন। যে সময় বাবা হারমান কাফকার সাথে তার দ্বন্দ্ব পৌছে যায় চরমে। পারিবারিক এ্যাজবেস্টস কোম্পানির দায়িত্ব নিতে বাবা তাকে বাধ্য করেন। চাপিয়ে দেওয়া কাজটি তার শিল্পীসত্ত্বাকে দারুণ আহত করেছিল। এ সময়টিতে আত্মহননের চিন্তাও জেঁকে বসে তার মাথায়।

পুঁজির ক্লেদ, কোম্পানির হর্তাকর্তাদের দুর্ব্যবহার, কথায় কথায় চাকুরি হারিয়ে ফেলবার ঝুঁকি রক্তাক্ত করতো গ্রেগর সামসাকে। অপছন্দনীয় পেশাগত দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা তাকে পোকা বানিয়ে দিল ।

অবশ্য এর পরেও তার মাঝে আমরা শিল্পের ক্ষুধাটি অটুট থেকে যেতে দেখি। বাসার উটকো ভাড়াটেদের যখন তার বোন বেহালা বাজিয়ে শুনায়, নিজের কক্ষটি ছেড়ে সে ওই সঙ্গীতের নেশায় বেরিয়ে আসে সকল বিপদের আশংকা তুচ্ছ করে।

কাছের মানুষেরা তার কদাকার অবয়বটিকে ঘৃণা করছে, এতে সে প্রতিনিয়ত আহত হয়। কিন্তু তার করবার কিছু থাকেনা যেহেতু নিশ্চিতভাবেই একটা পোকা পুনরায় আর মানুষ হয়ে উঠতে পারেনা, কেন পারেনা? গল্পে আমরা কী দেখতে পাই?

স্বাভাবিকতায় সামান্য পরিবর্তনও মানুষ গ্রহণ করতে অক্ষম। এমনকি তা নিতান্ত আপনজনের ক্ষেত্রে হলেও। যেকোন পরিবর্তনই মানুষ প্রথম দফায় গ্রহণ করে নেতি ও নিষ্ঠুরতার সঙ্গে।

অন্তর্মুখী স্বভাবের কাফকা ধার্মিক হবার চেষ্টারত ছিলেন। প্রেম ও নারী বিষয়ে আজন্ম সুস্থির কোন সীদ্ধান্তে আসতে পারেননি। পিতার সাথে দ্বন্দ্বটা চিরকালই তাকে ভুগিয়েছে। নিজস্ব চিন্তাধারা প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েই তাকে বেছে নিতে হয়েছিল রূপক, প্রতীক, গল্প বলবার জটিল ও জান্তব এক কৌশল।

প্রতিটি গল্পের পরিণতিই তাকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল নিয়তির নিষ্ঠুর হাতুড়ির নিচে। নিজে যা কখনও এড়িয়ে যেতে পারেননি, তার গল্পের চরিত্রদের জন্যেও (এখানে উজ্জ্বল গ্রেগর সামসা) সে ব্যবস্থা করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল।

নিয়তি এড়ানো সম্ভব না হলেও তার বিরুদ্ধে কাফকা দাঁড়ান নতুন স্বপ্ন নিয়ে। বিধ্বস্ত সামসা পরিবারের গল্পটির শেষ টানতে চান এক আশাবাদ ব্যাক্ত করেই। যেহেতু কঠিন পৃথিবী কখনই মানুষের জীবনমুখী যাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারেনা, একজন লেখক হিসেবে আশা ছেড়ে দিতে রাজি ছিলেন না তিনিও।

জীবন থেমে থাকেনা, যুদ্ধ-মৃত্যু-মারি একে ধ্বংস করে দিতে চায়, কিন্তু ওতে সমস্ত আশা কি নেভে? হয়ত সেটি টিমটিমে হয়েও জ্বলতে চেষ্টা করে। হয়ত এটুকুই মানবজাতির অর্জন।



প্রচ্ছদের ছবি – প্রিয় বোন ওটলার সঙ্গে কাফকা, প্রাগ

[রচনাকাল – জানুয়ারি ২০১৫, বাংলানিউজ টয়েন্টিফোরে পূর্বপ্রকাশিত]

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন

প্রিমিয়াম সব লেখা ইনবক্সে পেতে নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।

অভিনন্দন! আপনার সাবস্ক্রিপশন সম্পন্ন হয়েছে।

There was an error while trying to send your request. Please try again.

এনামুল রেজা will use the information you provide on this form to be in touch with you and to provide updates and marketing.