সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা ভাষাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক ● সালমান রুশদি

রুশদি এই সাক্ষাৎকারটা দিয়েছিলেন ২০১৩ সালে, সাংবাদিক ও প্রকাশক শন র‍্যানডলকে। তখন এপ্রিল, নিউ ইয়র্কের কোন এক বহুতল ভবনের অডিটোরিয়ামে শুরু হতে যাচ্ছে এই বৃটিশ-ইন্ডিয়ান উপন্যাসিকের নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন পেন ওয়ার্ল্ড ভয়েসেসের বাৎসরিক উৎসব।  আলাপটিতে ঘুরে ফিরে এসেছে লেখক ও সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের অধিকার, স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় লেখকের ঝুঁকি ও করণীয়, পেন কীভাবে লেখক, শিল্পী ও সাংবাদিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে থাকে, এসব বিষয়। প্রথমত এই আলাপচারিতা আমার কাছে খুব দরকারি মনে হয়েছিল। আপনাদেরও ভাল লাগতে পারে সে চিন্তা থেকেই অনুবাদ করে ফেলি ২০১৯ এর অক্টোবরে, দুই দফায়। চীনের মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক কিছু কথা রুশদি এখানে বলেছেন। এই গ্লোবাল প্যানডেমিকের সময়ে আপনি গভীর ভাবে সেই কথার সত্যতা টের পাবেন।


এ বছর, পেন ওয়ার্ল্ড ভয়েসেস ফেস্টিভাল অফ ইন্টারন্যাশনাল লিটারেচারের প্রতিপাদ্য বিষয় শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি, এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সাহসিকতার ভূমিকা। ঠিক কোন কারণে আপনারা প্রতিপাদ্য হিসেবে সাহসিকতাকে বেছে নিয়েছেন?

সবচেয়ে সহজাত প্রেরণা হচ্ছে এটা: এ মুহূর্তে পৃথিবীর অনেক দেশেই আপনি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবেন না। ঐসব দেশে নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলতে লেখক এবং সাংবাদিকদের দুঃসাহসী হতে হয়। রাশিয়ার কথাই ধরেন, প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে খুন হয়ে যাবার অস্বস্তিকর স্বভাব আছে রাশিয়ান সাংবাদিকদের। জেলে বন্দী হওয়া আর কখনও কখনও সত্যিই খুন হয়ে যাওয়া সাংবাদিকদের পক্ষে অনেক ক্যাম্পেইন চালিয়েছে পেন।

চীনের অবস্থাও সুবিধার না, ভেবে খুব ভাল লাগছে যে আই উইউই’র সঙ্গে একটা ভিডিও সংযোগের ব্যাবস্থা করা গেছে, লোকটা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সেদেশের সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে। এটাও এক ধরণের সাহস—যে কোন ধরণের স্বৈরতন্ত্র আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে কলিজা লাগে।
আমার কথা বলি, আমি যা দেখেছি সবসময়, সত্যিকার শিল্প নির্মাণ করতে লেখক ও শিল্পীদের যে জিনিসটা দরকার তা হচ্ছে সাহস। সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা ভাষাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক, এবং আমি আশা করি এসবের পাশাপাশি রাজনৈতিক সাহসের ব্যাপারটাকেও আমরা তুলে ধরতে পারবো।

গত বছর আপনার “আর্থার মিলার ফ্রিডম টু রাইট” শীর্ষক বক্তৃতায় বলেছিলেন যে শিল্প সেন্সরশিপের চেয়ে শক্তিশালী, কিন্তু শিল্পী চিরকালই দুর্বল থেকে যান। এ ব্যাপারটাই কি পেন এন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড ভয়েসেস উৎসবকে আজ এত দরকারি করে তুলেছে?

নিশ্চিতভাবেই এ কারণটা পেনের মত সংগঠনগুলোকে দরকারি করে তুলেছে। আমি আগেও বলতে চেষ্টা করেছি, লেখক এবং শিল্পীদের আসলে একটা বিদ্বেষপরায়ণ পরিবেশে টিকে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে এই ইন্টারনেটের যুগে, নিষিদ্ধ কিছু খুঁজে পাওয়া খুবই সহজ যদি আপনি জানেন কোথায় খুঁজতে হবে। শিল্পীরা, যাই হোক, একটা ক্রমবর্ধমান বিপদের মধ্যেই আছেন, আর শুধু শিল্পীরা নন। গভীর দুশ্চিন্তার বিষয়, বছরের পর বছর কাজ করতে গিয়ে খুন হওয়া সাংবাদিকদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। নিরপেক্ষভাবে কেউ আর তাদের দেখতে চাইছেননা, সবাই ভাবছেন তারা সব সময়ই কোন দলের পক্ষ বা বিপক্ষের লোক।

এটা সত্য যে মানুষের শরীর ভঙ্গুর, সে তুলনায় তার চিন্তাধারা শক্তিশালী। লেখকদের রক্ষা করাটা আমাদের জন্য খুব জরুরি যাতে নিজেদের কাজটা তারা করে যেতে পারেন।

ঐ একই লেকচারে আপনি বলেছিলেন, লেখক, সাংবাদিক, ও শিল্পীদের রক্ষা করার একটা উপায় হতে পারে যে তাদের উপর সব সময় স্পটলাইট ধরে রাখা।

একদম। আমার বন্ধু ইতালিয়ান লেখক রবেরতো স্যাভিয়ানোর কথাই ধরেন, ক্যামোরা মাফিয়ারা ওকে প্রাণনাশের হুমকির মধ্যে রেখেছে (নেপলসের ক্যামোরা মাফিয়াদের মুখোশ খুলে দেওয়া ‘গমোরা’ বইটি লেখার জন্য)। স্যাভিয়ানো বারবার বলেছে, জনগণের চোখের সামনে শুধু নিজের উদ্দেশ্য নয়, নিজেকেও সে তুলে ধরতে চায়, তাই একটা বৈকালিক টিভি অনুষ্ঠানের কো-হোস্টিং করছে নিয়মিত। ও খুব ভালভাবেই বুঝতে পারছে যে, লোকজনের চোখের সামনে এই প্রতিদিন হাজিরা দেওয়ার বিষয়টি বা গণ-আকর্ষণ তাকে আগের চেয়ে বেশি নিরাপদে রেখে চলেছে।

আমার ধারণা, গোটা বিশ্বেই এটা সত্য। হিংস্র ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যাবস্থাগুলোর একটা অদ্ভুত মিল আছে। তারা নিজেদের সম্পর্কে কোন নেতিবাচক প্রচারণা পছন্দ করেনা। যদি আপনি তাদের উপর্যপুরি বিব্রত করে তুলতে পারেন, তারা ঠিক সেই কাজটাই করবে যা আপনি তাদের থেকে আশা করেন, যেমন তারা কাউকে জেল থেকে ছেড়ে দেবে বা ধড়পাকড় বন্ধ রাখবে, তাদেরকে বিব্রত করে তোলার এ কাজটা পেন অনেকবারই করতে পেরেছে। পেন/বারবারা গডস্মিথ ফ্রিডম টু রাইট পুরস্কার এমনি একটা উপায় যা কোন লেখককে জনগণের সামনে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। অতীত যাচাই করে দেখেন, দেখবেন যে উদ্দেশ্য পূরণে খুবই সফল এই পুরস্কার। এর আগে যারাই এটা পেয়েছেন, তাদের অধিকাংশই ছ’মাস বা এক বছরের মধ্যে ছাড়া পেয়েছেন জেল থেকে। এখানে একমাত্র অস্ত্র হল পাবলিক এটেনশন, কিন্তু মজার বিষয় এটা কাজ করে।

আরেকটা বিষয়, স্বৈরতন্ত্র চায়না যে তাদের নিয়ে কেউ ঠাট্টা করুক। এ মুহূর্তে আমি ভাবছি মিশরীয় ব্যাঙ্গধর্মী লেখক বাসেম ইউসেফের কথা। ইসলাম ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে অপমান করবার দায়ে সম্প্রতি যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সালমান রুশদির সাক্ষাৎকার
সালমান রুশদি, ছবি – এলয় আলোনসো

আই উইউই ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে এই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। তিনি আলাপ করবেন গণতন্ত্র এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে। এমন কোন প্রশ্ন আছে, যেটা জিজ্ঞেস করতে মুখিয়ে আছেন আপনি?

হ্যাঁ। আমার ধারণা স্বৈরশাসকেরা নিজেদের খুবই মহান ভেবে থাকেন, এবং কেউ তাদের মহানুভবতাকে খাটো করুক এটা পছন্দ করেননা মোটেও, যে কারণেই অনবরত তাদেরকে বিদ্রুপ করে যাওয়াটা বেশি দরকারি। পৃথিবীতে বহু মানুষ আছেন যারা ঐসব সমাজের মধ্যে থেকেও বিদ্রুপটা চালিয়ে যান, স্বৈরশাসকদের নিয়ে ঠাট্টা করতে পিছপা হননা। সুতরাং এখন লেখক বলতে আমরা কাদের বুঝবো, সেই সংজ্ঞাটা বিস্তৃত করতে হবে, ব্লগার, কার্টুনিস্ট, গীতিকার, ভিজুয়াল আর্টিস্ট—এই সব ধরণের মানুষেরা যার যার মতই দারুণ সাহসী।

তিনি নিজে থেকে যেটুকু বলবেন আমি সেটুকুই শুনতে চাই। যে বিপজ্জনক অবস্থায় তিনি আছেন, সেই অবস্থাকে আমি আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে চাইনা।

আমি তাকে তার কাজ নিয়েই প্রশ্ন করতে চাইবো আসলে। স্বভাবত আমার মনে হয়, যে সব লেখক আর শিল্পী ঐ বিচিত্র পরিস্থিতিতে আছেন, একজন নিগৃহীত শিল্পীর জীবন কাটাচ্ছেন, সবাই তাদের নিগ্রহ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন। তারা যেসব কথা বলতে চান, নিজেদের এই নিগ্রহের বিষয়টা হয়ত সেই তালিকার শেষের দিকে থাকবে।

এমন একটা সময় ছিল, যখন বিশ্বের সকল সাংবাদিকই আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন, কিন্তু তারা কেউই আমার লেখালিখি নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন না। এর চেয়ে হতাশার বিষয় আর কী হয়ে পারে? আমার মনে হত এসবের মধ্যে ‘শিল্পী হিসেবে আমার শ্বাসরোধ করার চেষ্টা চলছে’ এরকম একটা ব্যাপার ছিল। সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিশোধ যা আমি নিতে পারতাম, তা হল লেখা। তাই লেখালেখি নিয়েই আই উইউইকে আমি প্রশ্ন করতে চাইব, তিনি কি এখন তেমনটাই অনুভব করছেন সেই সময়টায় যেমন আমি অনুভব করতাম, যদি তাই হয় আমরা কীভাবে ব্যাপারটা সামলাতে পারি? আমাদের কি শিল্প এবং রাজনীতি নিয়ে কথা বলা উচিত না? যদি তিনি এই আলাপে আসতে চান, আমরা তা করবো। আমার ইচ্ছা আলাপটা তিনিই চালিয়ে নেবেন যেদিকে নিতে চান।

এ বছর আর্থার মিলার ফ্রিডম টু রাইট বক্তৃতা দেবেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক সোনিয়া সোটোমেইয়র। তাকে নির্বাচিত করবার কারণ কী?

প্রথমত চমৎকার একটা আত্মজৈবনিক লিখেছেন তিনি। শিল্প-সাহিত্য নিয়ে এ মুহূর্তে অনেকগুলো আইনি ইস্যু চলমান আছে, ওসব নিয়ে একজন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ছাড়া কেই বা ভাল কথা বলতে পারবেন? বহু গুরুত্ববহ ব্যাপার রয়েছে যা সুপ্রিমকোর্টকে সামলাতে হবে আগামী দিনগুলোয়। খোদ আমেরিকাতেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত ইস্যু আছে (যেমন আছে বহির্বিশ্বেও)।

আমি যখন পেনের প্রেসিডেন্ট ছিলাম, এ সংগঠনের চিন্তাধারায় একটা বড় পরিবর্তন এসেছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে অন্যান্য দেশগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে যদি কথা বলতে হয়, নিজেদের দেশের মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে কাজ করবার শক্তিও আমাদের থাকতে হবে। একটা দেশে জনগণের উপর অত্যাচার চালানো হচ্ছে, আমরা গিয়ে তাদের বাধা দিতে গেলে যদি সেই দেশ বলে, ‘ইউনাইটেড স্টেটসও তো একই কাজ করছে’, তাহলে গোটা ব্যাপারটাই অর্থহীন হয়ে যায়। বুশ এডমিনিস্ট্রেশনের শুরুর দিনগুলোতে পেন স্বীদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, শুধু আন্তর্জাতিক নয়, নিজ দেশের সিভিল রাইটস আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারেও আমরা সোচ্চার থাকবো, এটাই হবে আমাদের মূল কাজ।

সোটোমেইয়র এ বিষয়টা নিয়ে বলতে পারবেন। আমি শুনতে চাইবো যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আসলেই এ দেশে মানবাধিকার ও সিভিল রাইটস পরিস্থিতি মজবুত হয়েছে না কি আরও দুর্বল হয়ে উঠেছে, যদি তাই হয়, তা কেন হচ্ছে, কীভাবে আমরা পরিস্থিতির আরও উন্নতি ঘটাতে পারি?

আপনি কি রচনা ও পাঠের স্বাধীনতাকে একটা মানবাধিকার হিসেবে দেখেন?

যে কাজটা মানবজাতি চিরকাল করে এসেছে তা হল গল্প বলা। কেউ গল্প শুনতে চেয়েছে, এবং কেউ পড়তে চেয়েছে। শিশুরা জন্মের পর সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার পর প্রথম যে কাজটি করে, ওরা গল্প শুনতে চায়, গানে গানে হোক বা মুখে মুখে। মানবজাতির গভীরতম আকাঙ্ক্ষার একটি হল গল্পের আকাঙ্ক্ষা। পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র প্রাণী যারা এ কাজটা করি, আমরাই একমাত্র সৃষ্টি যারা গল্প বলতে পারি, এবং কখনও সেই গল্পগুলো হয় সত্যিকার গল্প, কখনও বা তৈরি করা।

এরপর আসে বড় গল্পের পালা, একটি সুবিশাল আখ্যানের মধ্যে আমরা বসবাস করি, যা নির্মাণ করে জাতি, পরিবার, ও গোত্র, এবং আরও অনেক কিছু। এ গল্পগুলো গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করি আমরা, বেঁচে থাকার উপকরণের একটা অংশ করে তুলি, যা মানবপ্রকৃতির পক্ষে ক্ষতিকর এমন যে কোন কাজে আমাদের বাধা দিতে সক্ষম।

কোনটা বেশি বিধ্বংসী: সেন্সরপ্রবণ প্রশাসন নাকি মিথ্যুক প্রশাসন?

বাহ। যে কোন একটা বেছে নেবার সুযোগ কি পাব?

না, তা পাবেন না।

তাহলে ব্যাপারটাকে এভাবে দেখেন: যদি এমন একদল কর্তৃপক্ষ থাকে যারা আপনার কোন কথাই সেন্সর করেনা, কিন্তু মিথ্যুক, তাহলে এটা হওয়া খুব সম্ভব—মত প্রকাশের স্বাধীনতার হিসেব অনুযায়ী—আপনি যাই বলেন না কেন তারা জনগণের সামনে অসত্য কথা প্রকাশ করবে। আর যদি সেন্সরপ্রবণ কর্তৃপক্ষের কথা বলি, তাহলে আপনি যা ভাবছেন প্রকাশই করতে পারবেন না, সুতরাং এক অর্থে তারা যা ইচ্ছে তাই বলতে পারবে।

শেষ পর্যন্ত, মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সবচেয়ে দরকারি কথা হল, এটা এমন এক অধিকার যা থেকে আরও অনেক অধিকার জন্ম নেয়। যদি আপনি চিন্তাভাবনা লিপিবদ্ধ করতে না পারেন, এবং যদি আপনি অন্যের চিন্তাভাবনার সমালোচনা লিপিবদ্ধ না করতে পারেন, তাহলে তো আপনি ক্ষমতাহীন। লোকজনের মত প্রকাশের ক্ষমতা হরণের মাধ্যমেই স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো তাদের শক্তিবৃদ্ধি করে।

সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হল, মিথ্যে ও সেন্সর যদি মিলেমিশে যায়, চীনে যা সচরাচর হতে দেখছি আমরা, ওখানে এই সম্মিলিত শক্তি এতই ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে যে বহু জনগণ মিথ্যেকেই সত্য হিসেবে বিশ্বাস করে। সত্যকে সেন্সর করা বা ছেঁটে ফেলার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, দীর্ঘদিন এটা করার ফলে লোকজন ভুলেই যায় সত্য জিনিসটা ঠিক কী রকম, এবং যাই বলা হয় লোকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে। আমার ধারণা চীনারা এটা ভালভাবে শিখে নিয়েছে। এমনকি, তারা জনগণের একটা অংশকে বিশ্বাস করাতে পেরেছে যে তিয়ানানমেন স্কয়ারের শহীদেরা বিজাতীয় মতবাদে অনুপ্রাণিত ছিল, বহু চৈনিক লোকজন আজ আর তাদের নায়ক হিসেবে দেখেনা, তারা ভাবে তিয়ানানমেন স্কয়ারের শহীদেরা ছিল সঙ্কট সৃষ্টিকারী। সেন্সর আর মিথ্যের মিশ্রণ নতুন এক ধরণের সত্য তৈরি করে, যা আসলে মিথ্যা, কিন্তু লোকে যাকে সত্য হিসেবে দেখতে পায়।

সাংঘর্ষিক একটা যুগে লেখকের ভূমিকাটা কী হতে পারে? উপরের কথাবার্তা থেকে আমরা বুঝতে পারছি, আম জনগণের চেয়ে একজন লেখকের দায়িত্বটা আলাদা।

সবকিছু মিলিয়েই একজন লেখক, তিনি নাগরিক এবং নাগরিকত্বের নিয়ম-কানুন মেনে চলার দায় আছে তার, আর সবার মতই। কয়েকবছর আগে পেন ওয়ার্ল্ড ভয়েসেস উৎসবে ডেভিড গ্রসম্যান আর জকোন্দা বেলির সঙ্গে হওয়া একটা আড্ডার কথা মনে পড়ে আমার, ওরা দুজনেই এমন দুটি দেশের মানুষ যেখানে মানুষের রোজকার জীবনের এক কেন্দ্রীয় বিষয় হল রাজনীতি। দুজনেই বলতে গেলে একই কথা বলেছেন: এমনকি অমন দেশ আর সময়ে বাস করেও লেখকদের জন্য এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ—এগুলো আমার শব্দ, ওনাদের না—ঐসব ছোট ছোট বিষয় নিয়ে লিখে যাওয়া উচিত যা আমাদের মানুষ করে তোলে, এবং ঐসব মহান বিষয়ও যা আমাদের মানুষ করে তোলে। ভালবাসা, ঘৃণা, পরিবার ও আকুলতা এবং আরও যেসব বিষয় আমাদের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে তাই নিয়েই লিখে যেতে হবে, এবং মানবতাকে ভুলে গেলে চলবেনা, বিশেষত যখন ইতিহাস আমাদের কানে গর্জন করে চলেছে।

আপনার কি মনে হয় শিল্পীকে শিল্প থেকে আলাদা করে দেখা সম্ভব?

হ্যাঁ, সম্ভব। আজকাল আমরা শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনে একটু বেশিই আগ্রহী হয়ে উঠছি, শিল্পীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং  অভিজ্ঞতার আলোকে তার শিল্পকে বুঝতে চেষ্টা করছি। আমি মনে করি, শিল্পীর অবস্থা বা পরিস্থিতি বা চরিত্র সম্পর্কে একদম কিচ্ছু না জেনেও আপনার একটা বই পড়া উচিত বা একটা ফিল্ম দেখতে পারা উচিত। মাঝেমধ্যে নিজেকে নিয়ে ভাবি আমি—মনে হয় লোকজন বড় বেশি জেনে ফেলেছে আমার সম্পর্কে, আফসোস হয় যদি তারা আরও কম জানতো এবং আমার বইগুলোকে শুধু বই হিসেবেই পড়তো। 

আমার ধারণা এমনটা হতেই পারে, কিন্তু আজকের যুগে ব্যাপারটা খুবই কঠিন, কোন শিল্পকে ব্যাখ্যা করার প্রধাণ উপকরণ এখন শিল্পীর ব্যক্তিজীবন। ব্যাপারটা সবসময়ই যে ভাল তা মনে হয়না আমার।

প্রশ্নটা নিয়ে একটু আগেই ভাবছিলাম কারণ সম্প্রতি ধরা পড়েছে যে সিরামিক শিল্পী চার্লস ক্রাফট একজন হলোকাস্ট অস্বীকারকারী, যিনি তার অপূর্ব সব চীনামাটির শিল্পে প্রায়ই নাৎসি উপাদানগুলো তুলে ধরেন। তার কাজ মূল্যয়নের সময় কি এই ব্যাপারটা আমাদের প্রভাবিত করতে পারে?

প্রভাবিত না করাটাই কঠিন ব্যাপার। এমন বহু ঘটনা আছে। এজরা পাউন্ডকে নিয়ে কী ভাববো আমরা—নিঃসন্দেহে এক মহান কবি এবং নিঃসন্দেহে একজন ঘৃণ্য লোক? লুই ফার্ডিনান্ড সেলিন সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়, যিনি নিশ্চিতভাবেই একজন নাৎসি সমর্থক, তা স্বত্তেও বিংশ শতাব্দীর এক অন্যতম মহান লেখক। ব্যাপারটা কঠিন, কিন্ত যথেষ্ট উদাহরণও আছে চারপাশে যেখানে আমরা শিল্পকে শিল্পী থেকে আলাদা করে দেখার একটা উপায় বের করে ফেলি, পাশাপাশি ব্যক্তি শিল্পীর অন্যায় চিন্তাধারাকে দুয়ো দিতেও ছাড়িনা। 


মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন