হেমিংওয়ের প্রেম ও পুরুষের পৃথিবীতে

কোন ভোর ভালো লাগলে, কোথাও বা গড়ের পিছনে সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হলে কোনদিন, কাঁধে হাত রেখেছি নিজের, ‘সত্যি তো, নাকি বই পড়ে শিখেছ?’ হবহু স্মরণ হচ্ছেনা লাইনগুলো, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কোন লেখায় পড়েছিলাম। খুব একটা ধাঁধা কি লেগেছিল? না সম্ভবত।

মানুষের জীবন-যাপনের প্রক্রিয়াটাই এমন যে সে সব সময় অন্যদের অন্য মানুষের চিন্তা ও কাজ থেকে অনবরত প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হবে।

বই পড়ে হোক, সিনেমা দেখে হোক, এমনকি যে লোকটা বছরভর কেবল ক্ষেতে কাজ করতো অন্য চাষীদের সঙ্গে আর নবান্নের মেলায় বায়োস্কোপে আইফেল টাওয়ার ও সংসদ ভবন দেখতো, ব্যক্তি হিসেবে সেও ছিল অন্যদের থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার এক সমষ্টিমাত্র।

এতসব কথা আমার মগজে ভিড় করছে মূলত রবার্ট খোন সম্পর্কে জেক বার্নসের একটা মন্তব্যে। এরা দুজনেই আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দা সান অলসো রাইজেসের চরিত্র।

উপন্যাসটার আরও এক আদুরে নাম আছে। ফিয়েস্তা। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের লোকজনের ভাষায় শব্দটাকে আত্মিকৃত যদি করি, সরলার্থে একে বলা চলে ‘আইড়ের নাড়ই’ (ষাঁড়ের লড়াই)।

১৯২০ সনের পারি নিয়ে যতই লিখি, যেভাবেই লিখি, আমার মুগ্ধতা ও অবসেশন ওতে ঠিক পরিস্কার হবেনা। যে প্রাচীন নগরীকে এখনও দেখা হয়নি সশরীরে, সময়টিতে ফিরে যাওয়াও অসম্ভব, যে সকল মানুষেরা শুধুই আমার বই ও মিডিয়ালব্ধ স্মৃতির অংশ হয়ে আছে, তাদের নিয়ে কেন এই কাতরতা? 

ঐ সময়ে সারা পৃথিবীর বিবিধ প্রান্তের শিল্পীরা এসে ভিড় জমাচ্ছেন পারির টালি বিছানো পথঘাট, বুলেভার্দ আর কাফেগুলোয়। ফরাসী দেশের এই রাজধানী তখন পৃথিবীর সমস্ত চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ, উপন্যাসিক, কবি, ফিল্মমেকার, গায়ক অথবা ভাস্করদের জন্য স্বর্গভূমি।

কম খরচে থাকা-খাওয়া যায়, চেষ্টা চরিত্র করলেই বন্ধুদের থেকে ধার মেলে, এমনকি ভাগ্য ভাল থাকলে বিত্তশীল কোন শিল্প অনুরাগীর সঙ্গ মিলে যায় যিনি নির্দ্বিধায় অর্থ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। এ ছাড়া সমমনাদের সঙ্গে আড্ডা দেবার সুযোগ তো আছেই।

দিন-রাত যে কোন সময় চলতে পারে আড্ডা। নৃত্য ও মদের আসর। বিখ্যাত-অখ্যাত যে কেউ যে কারও সঙ্গে মুহূর্তে মিশে যাচ্ছেন, তুমুল তর্কে টেবিল চাপড়ে একে অন্যের উপর রেগে গিয়ে ঝাঁপ দিচ্ছেন।   

হারানো প্রজন্মের পারি সম্পর্কে এমনটাই তো জেনে এসেছি আমরা চিরকাল। কিন্তু সময়টা আসলেই কি শুধু আনন্দ-হিল্লোলে পূর্ণ ছিল? নাকি অতিরিক্ত উচ্ছাসের শোরগোল ঢেকে ফেলেছিল একটা মহাযুদ্ধ আর অজস্র মৃত্যুর গ্লানি বয়ে বেড়ানো অসংখ্য তরুণ শিল্পীর চাপা আর্তনাদ? হারানো প্রজন্ম কেন বলা হত ওদেরকে?

গত শতকে পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তে শিল্প-সাহিত্যের বিপ্লব ঘটে যাবে যাদের হাতে, সেসব তরুণেরাই তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন পারির সেইসব আড্ডা। এদের মাঝে হেমিংওয়েও ছিলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নৈরাশ্য ও প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে করে আমেরিকার কানসাস থেকে এই ফরাসী শহরে তরুণ হেমিংওয়ে এসেছিলেন নতুন জীবনের আশা নিয়ে।

ফরেন করেসপন্ডেন্ট হিসেবে সাংবাদিকতা করছেন দিনে, সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিচ্ছেন স্বদেশী ও বিদেশী অন্যান্য এক্সপেট্রিয়েটদের সঙ্গে। আর লিখছেন। এসমস্ত দিন রাত্রির অভিজ্ঞতা থেকেই যে সান অলসো রাইজেসের জন্ম হয়েছিল, বইটা পড়তে পড়তে খুব টের পাওয়া যায়।

Inspiration behind the sun also rises
পারিতে বন্ধুদের সঙ্গে হেমিংওয়ে

একদল যুবক-যুবতী ঘুরে বেড়াচ্ছে পারির এ মাথা ও মাথা। এক কাফে থেকে আরেক কাফেতে ঢুকছে। একটু পরপরই গিলছে মদ। গল্প করছে। মদ গিলছে। লিখছে। প্রেম করছে। গান শুনছে বা গাইছে। আর মদ গিলছে।

খালি চোখে এদের জীবনের যেন কোন উদ্দেশ্য নেই। আনন্দের সমস্ত উপকরণ ছড়ানো ছিটানো চারপাশে। খোলা চোখে স্বাধীনতাও অবাধ। মূল্যবোধের চিন্তা নেই, চার্চের শেকল নেই, নেই প্রশাসনের কড়াকড়ি।

কিন্তু সব কিছুর মাঝেই যেন কী রকমের এক তিক্ততা। উপরে সবার হাসিমুখ। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সবাই জানে, কেউ তারা সুখী নয়, নিত্যদিন যে যার নিজস্ব হতাশায় ডুবসাঁতার খেলছে। কোথাও কিছু একটা যেন ক্ষয়ে যাচ্ছে রোজ। সুতরাং, একদিন তারা ঠিক করলো পারির এই চিরচেনা কাফে সোসাইটি থেকে কিছুদিনের মুক্তি তাদের চাই।

স্পেনের পামপ্লোনায় এগিয়ে আসছিল ফিয়েস্তার মৌসুম। বই পড়ে পড়ে পারির উপর বিরক্ত হয়ে ওঠা রবার্ট খোন, সাংবাদিক ও গোপনে লেখক হবার অভিলাষি জেক বার্নস, ইতিমধ্যেই কিছু খ্যাতি ও অর্থের মুখ দেখা উপন্যাসিক বিল গর্টন ঠিক করে ফিয়েস্তা দেখতে যাবে তারা।

যাত্রাপথে বেয়োন হয়ে স্পেনের বারগুয়েতে শহরে থামবে, পাহাড়ি নদী ইরাতিতে শিকার করবে ট্রাউট। সঙ্গে যোগ দেবে ব্রেট এশলি এবং তার বর্তমান প্রেমিক মাইকেল। ব্রেট এমন এক নারী যে অনবরত সঙ্গী বদল করায় আগ্রহী, যখন তখন যে কোন পুরুষের প্রেমে পড়ে যেতে পারে সে।

পারির চিরচেনা ও নিরস হয়ে উঠতে থাকা জীবনের বাইরে গিয়ে ওরা সবাই কি নিজেদের আবিস্কার করবে স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ষাঁড়ের লড়াইয়ের উন্মাদনায়? যেই উন্মাদনা, উন্মত্ত ষাঁড় ও এফিসিয়ানেডোদের ভিড়ে একদল পুরুষ মুখোমুখি হবে যার যার পৌরুষ ও অহমের সঙ্গে?  

খুব চিত্তাকর্ষক কোন গল্প উপন্যাসটা বলেনা। মূলত গল্পটা ক্লান্তিকর। অন্যদিকে এই ক্লান্তির বর্ণনা হেমিংওয়ে যে ভাষায় আমাদের শোনান, তা উত্তেজক। সোজাসাপ্টা সংলাপের মাধ্যমেই চরিত্র নির্মাণ হতে থাকে। উপন্যাসের পরিবেশে কেমন ঘুরপাক খেতে থাকে প্রচ্ছন্ন কুয়াশা।

চরিত্রগুলো খুবই জীবন্ত। এবং এরা বৈচিত্র্যময়। অতীতে যে যা করে এসেছে, এমন নয় সেইসব ঘটনাবলি এই বৈচিত্র্যময়তার ভিত্তি। চরিত্রগুলো আসলে বিচিত্র হয়ে ওঠে তাদের প্রায় কোন কিছুই না করে সময় কাটিয়ে দিতে পারবার ক্ষমতার মধ্যে। উপন্যাসের ভাষা আর এদের দিন যাপন মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে চলে প্রতিটি পৃষ্ঠায়।   

হেমিংওয়ের বিখ্যাত রচনাশৈলীর প্রমাণও যথাযথ মেলে। যা বলা হচ্ছেনা, তা মূলত লুকিয়ে আছে যা বলা হচ্ছে সে সমস্ত শব্দের নিচেই। জেক বার্ন্স ব্রেট এশলির প্রেমে অন্ধপ্রায় , বহুগামী হলেও জেককে অপছন্দ করেনা ব্রেট, কিন্তু কেন তারা প্রেম করতে পারেনা? কোথাও এই কারণ স্পষ্ট করে বলা হয়না, ইঙ্গিত দেয়া হয় মাত্র। কিন্তু পাঠক বুঝে নিতে পারে। অন্তত বুঝবার চেষ্টা করলে তা বৃথা যাবেনা বলেই মনে হয়।  

বাড়তি পাওনা হিসেবে মেলে এক আমেরিকান লেখকের ইউরোপিয়ান পরিবেশ, প্রকৃতি ও পাশ কাটিয়ে যাওয়া বিদেশী মানুষদের সংক্ষিপ্ত অথচ প্রায় দৃশ্যমান মনোজ্ঞ বর্ণনা। লেখক হিসেবে হেমিংওয়ের জনপ্রিয়তার অনেকগুলো কারণের একটা জবর কারণ খুঁজে পাওয়া যায় এই ব্যাপারটি থেকে।

মার্কিনীরা বিশ্বাস করে স্বতন্ত্র্য জাতিস্বত্তা হিসেবে একটা মজবুত পরিচয় আছে তাদের। সেই পরিচয় নিয়ে বিদেশের মাটি ও সংস্কৃতির মাঝখানে কীভাবে তাদের এক লেখক পৃথিবীকে আবিস্কার করছে? আর কোন কারণ যদি নাও থাকতো, আমেরিকানরা শুধু এই একটা ব্যাপার জানবার ইচ্ছেতেও হেমিংওয়েকে নিজেদের বুকশেলফে যায়গা দিতে পারতো অনায়াসে।

যে মন্তব্যের ইশারা দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম, সেখানে ফিরে আসা যাক।

উপন্যাসের এক যায়গায় জেক বার্নস জানায় যে, রবার্ট খোন এক ফরাসী লেখকের বই খুব পড়ছে আজকাল, যার বইয়ের পৃষ্ঠা ভরে আছে পারির দুর্নামে। সে অনুমান করে, পারি আর খোনকে টানছেনা কেননা তার ঐ পছন্দের লেখক বলছেন পারি ভাল না।

অর্থাৎ খোন মূলত বই থেকে শেখা জীবন কাটাতে চায়, বা না চাইলেও সে আদতে তার পছন্দের লেখকদের বই থেকে উঠে আসা একটা চরিত্রই হয়ে ওঠে প্রতিনিয়ত। সে বিবাহিত ও ডিভোর্সি, দীর্ঘদিন ধরে প্রেম করে কোন নারীকে সে নিষ্ঠুরের মত ছেড়ে দিতে পারে, নিদারুণ প্রত্যাখ্যানের পরেও ব্রেটের পেছনে সে আঠার মত লেগে থাকতে পারে নির্দ্বিধায়।  

কিন্তু জেক বার্নস কি তেমনটা চায়? তুর্গেনেভের ‘আ স্পোর্টসম্যান’স স্কেচেস’ সে নিয়মিত পড়ে, যখনই মন অশান্ত থাকে, এ বই পড়লে তার ভাল লাগে। এ ছাড়া আরও অনেক দৃশ্যে দেখি সে বই পড়ছে, মাছ ধরবার অবসরে, ট্রেনের কামরায়। কিন্তু বাস্তবতা দিয়ে সে বড় বেশি পীড়িত, যে কারণে খোনের মত সে হতে পারেনা। তার মেকি আচরণে জেক বিরক্ত হয়, আবার বন্ধু হিসেবে ওকে সে পছন্দও করে।

ঠিক এমন দুটি পাশাপাশি চরিত্র তৈরি করে হয়ত হেমিংওয়ে নিজেকে তার অন্যান্য এক্সপেট্রিয়েট লেখকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চান। লেখক হিসেবে তার নিঃসঙ্গ যাত্রা শুরু হয়। সাংবাদিক ব্রুস বার্টনের কলমে লেখা হয় সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘লোকটা এমনভাবে লেখে যেন আগের কোন লেখকের রচনা সে পড়েনাই, লেখালেখির কৌশলটা যেন সে নিজের মত করে আবিস্কার করেছে।’

এই উপন্যাসের নাম কেনই বা ফিয়েস্তা আর কেনই বা দা সান অলসো রাইজেস?

সম্ভবত, হেমিংওয়ে তার প্রেম ও পৌরুষেয় দর্শনের যোগ্য রূপক খুঁজে পেয়েছিলেন ষাঁড়ের লড়াইয়ের মাঝে। ষাঁড় এক বুনো অদম্য শক্তি, তার সঙ্গে ডিল করে বুদ্ধিমান ও চৌকষ বুলফাইটার। যে লড়াইয়ে ষাঁড় মরবে এটাই প্রত্যাশিত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে দর্শকেরা চায় বুলফাইটার বিপদে পড়ুক, যত বিপদ তত উত্তেজনা। লড়াকুর এক মুহূর্তের ভুলে প্রমত্ত ষাঁড়ের ধারালো শিং বিঁধে যেতে পারে তার দেহে আর মৃত্যু হতে পারে নিমেষেই।

পুরুষ চরিত্রগুলো অনবরত ঘুরতে থাকে একজন নারীকে কেন্দ্র করে। হিংসা এক নতুন মাত্রা পায় তাদের জীবনে। সবাই তাকে পাবেনা, এটা জেনেও প্রত্যেকেই যেন এক অলিখিত যুদ্ধে নামে। পুরুষ মূলত মৃত্যুমুখী, এটাই কি হেমিংওয়ে বলতে চান?

আজ থেকে বহুদিন আগে কথাশিল্পী আবুল ফজল এই উপন্যাসটির ধারহীন এক অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু তার দেয়া বাংলা নামটা ছিল তুলনাহীন। তবুও সূর্য ওঠে। ফিয়েস্তার রঙিন ও রক্তাক্ত দিন পেছনে ফেলে ওরা সবাই তাদের পুরনো জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। যে নৈরাশ্য থেকে কয়েকদিনের মুক্তি চেয়েছিল এই দুঃখী মানুষের দল, ওরা বোঝে যে পুরনো ক্ষতের কাছেই তাদের ফিরে যেতে হবে। কেননা যে নদীর তীরে অন্ধকার নামে, সেই একই তীরেই তো সূর্য ওঠে, আবার।


প্রথম প্রকাশ – অক্টোবর ২০১৯। অপাঠ্য ভ্রমণ, বার্তা২৪.কম।

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন