সাহিত্যের ভাষা কি বানানো জিনিস

চিন্তা দিয়ে যে ভাষা নির্মাণ হয়, তা বেশি দামি। ভাষা দিয়ে নির্মিত চিন্তাও একটা নির্মাণ, তবে এই অবস্থায় ভাষা চিন্তাকে খেয়ে ফেলে। ভাষাকে বাঘ হতে দেয়া যাবেনা। আসল শিকারি বা ফিটেস্ট হতে হবে চিন্তাকে

সাহিত্য একটা করে তোলার জিনিস। ভাষাও বানিয়ে তোলা জিনিস। দুইটাই নির্মাণ করতে হয়। মানে এইরকম করে আমরা ভাবতে পারি।

বাংলা ভাষার উদাহরণ দিলে সহজে আমরা ধরতে পারবনা। কিন্তু খালি চোখে ইংরেজীকে তো একই রকম মনে হতে পারে। যেহেতু তা না, ক্লাসিক আমেরিকান সাহিত্যের দুই গ্রেট হেমিংওয়ে আর ফকনারকে নিয়ে আমি বলতে পারি আপনাদের।

ফকনারের ল্যাংগুয়েজে পাবেন আমেরিকান সাউথের টোন, মানে লোকের মুখের ভাষাটা বা এক্সপ্রেশনই যেখানে কমপ্লেক্স।

বিষয়টা বুঝিয়ে তুলতেই ফকনারের লাইট ইন অগাস্টের এই অংশটা পড়ে দেখা যেতে পারে –

Memory believes before knowing remembers. Believes longer than recollects, longer than knowing even wonders. Knows remembers believes a corridor in a big long garbled cold echoing building of dark red brick sootbleakened by more chimneys than its own, set in a grassless cinderstrewnpacked compound surrounded by smoking factory purlieus and enclosed by ten food steel-and-wire fence like a penitentiary or a zoo, where in random erratic surges, with sparrowlike childtrebling, orphans in identical and uniform blue denim in and out of remembering but in knowing constant in the bleak walls, the bleak windows where in rain soot from the yearly adjacenting chimneys streaked like black tears.

Light in August, William Faulkner

লাল চিহ্নিত শব্দগুলা দেখেন। প্রথমত, এইগুলা শুধু বিচিত্র না, সচরাচর গ্রামাটিকালি ইনকারেক্ট শব্দ-বাক্যও বলা যেতে পারে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক ভুল শব্দ-বাক্য বলি। মনের ভাষাটা প্রকাশ করাই সেখানে আমাদের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। এবং বলতে বলতে ভুলকে শুদ্ধ করে তুলি।

দ্বিতীয়ত, ফকনারের ব্যাখ্যার ধরণ ও বাক্যের ব্যবহার দেখেন।

ধরা যাক, প্রথম বাক্যের অর্থ এইভাবে করলাম: “আমরা যা জানি তা মনে করতে পারি অল্পই, কিন্তু যাই মনে করতে পারি স্মৃতি হিসেবে তাই গ্রহণ করি।”

এই বাক্য প্রতিষ্ঠা করতে উনি কেমন উদ্ভট লম্বা সব উদাহরণ এনেছেন। এতে যা হচ্ছে, খেয়াল যদি রাখা যায়, পাঠক দর্শক হয়ে দৃশ্যপট কল্পনা করবেন, দৃশ্যের সাথে সাথে ফিলসফিটা বুঝে উঠবেন আর জিনিসটা ধাক্কা মারবে হৃদয়ে।

এমন না ভাবার কোন কারণ নাই যে, এইভাবে ভাষার নির্মাণ আউট অব নোহয়্যার করেছেন ফকনার। সাউথের লোকজন যে কোন ঘটনার ব্যাখা সম্ভবত এভাবেই দিতেন। মানে আমরাও তো দেই, কথা বলতে গিয়ে সেইটার প্রতিষ্ঠায় অনেক ঘটনা এনে থাকি।

আরেক গ্রেট মার্ক টোয়েনের কথা বলি। সাউথের না হয়েও যার বিখ্যাত বই হাকলবেরি ফিনের অভিযানকে সাউদার্ন বলেই চিহ্নিত করা যেতে পারে। তার মাঝেও এই কমপ্লেক্সিটি পাওয়া যায়।

খেয়াল করলে দেখবেন টম সয়্যার বা হাকফিনের মত অল্প বয়সি চরিত্রগুলোও সহজ কথ কেমন লম্বা বাক্যে বলে, একটা কথা থেমে থেমে না বলে অনেক উপাদান মিশিয়ে বলে। মনে হবে যে ঐ উচ্ছন্নে যাওয়া ভবঘুরে চেংড়াও সাহিত্য করছে।

It’s lovely to live on a raft. We had the sky, up there, all speckled with stars, and we used to lay on our backs and look up at them, and discuss about whether they was made, or only just happened- Jim he allowed they was made, but I allowed they happened; I judged it would have took too long to make so many.

Adventure of Huckleberry Finn, Mark Twain

ফকনার এই বিষয়টা তার ভাষায় তো এনেছেনই, পাশাপাশি এনেছেন অনেক ফিগার অব স্পিচ, যে গুলা কেবল সাউথের নিজস্ব ছিল ঐ সময়ে।

সেই দিক দিয়ে হেমিংওয়ের ইংরেজী পুরোটাই আলাদা। সেইটা গল্প বা কাহিনী বলার টেকনিকের জন্যই শুধু আলাদা না।

আমার মনে হয়, প্লেইন এন্ড সিম্পল এই ভাষা হেমিংওয়ের প্রবাসে কাটানোর ফল।

কুবান বা ফরাসী বা এস্পানিওল লোকজন ইংরেজী ভাষাটাকে যেমন সিম্পল কিছু শব্দ বাক্য মিলিয়ে সহজে বুঝতে চায়, হেমিংওয়ে মনে হয় এই পার্সপেক্টিভও নিজের সাহিত্যভাষায় যোগ করতে পেরেছিলেন।

নিজের বাক্যগুলো পড়লে তার ইশারামূলক ও সরাসরি বলার প্রবণতার যে ককটেল, তা বোঝা যাবে –

How little we know of what there is to know. I wish that I were going to live a long time instead of going to die today because I have learned much about life in these four days; more, I think than in all other time. I’d like to be an old man to really know. I wonder if you keep on learning or if there is only a certain amount each man can understand. I thought I knew so many things that I know nothing of. I wish there was more time.

For Whom the Bell Tolls, Ernest Hemingway

আমেরিকার বাইরে প্রচলিত যে আমেরিকান ইংলিশ, সিনেমার স্ক্রিপ্ট সচরাচর যে ভাষায় লেখা হয়, আমরা যারা বাইরে থেকে আমেরিকার ভাষা সহজে বুঝে যাই, এই ভাষার নির্মাণে হেমিংওয়ের অবদান আছে। মানে একটা লম্বা লিগ্যাসি থেকেই তা আজকের সহজ সরল চেহারায় এসেছে সম্ভবত।

সহজ কথায়, মান ভাষা বলে যে ঘটনাটা, এইটা সব ভাষাতেই থাকতে পারে। কিন্তু লেখকেরা ভাষা বিনির্মাণ করেন নিজের মত, মানে ভাষার দাস না গ্রেট লেখকেরা।

নিজের যেইভাবে ইচ্ছা, যা তার দর্শন ও অব্জার্ভেশন, এই মিলিয়ে নিজের সাহিত্যিক ভাষা আমি আপনি বা সাহিত্যিকেরা তৈরি করতে পারি।

বানানো বা নির্মাণ শব্দটায় জোর দেই। যে ব্যক্তি সাহিত্য করেন না, তিনিও ভাষা নির্মাণে অংশ নিয়ে থাকেন। লম্বা সময় ধরে, অনেক জন মিলে।

ন্যাচারাল বা মুখের ভাষার সাহিত্য ধারণাকেও তাই দুর্বল বলেই মনে হয়। মূলত শক্তিশালী লেখক মুখের ভাষা, ডিকশনারি, মান ভাষা সব ভেঙেচুরে দিতে পারেন। এই সম্ভাবনা তার আছে।

সব কিছুই বানিয়ে নেয়া বস্তু। তাই ভাষাও সাহিত্যিক হিসেবে আপনি বানাবেন, বা বানাতেই পারেন, যত এইক্ষেত্রে নিজেরে স্বাধীন করে তোলা যাবে ততো সম্ভাবনা।


[রচনাকাল: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২১]

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন