পাঁচটি অসময়ের গল্প

ধবলগাঁওয়ের লোকজন

সন্ধ্যায় ওরা এলো একটা ট্রলারে চড়ে। মানুষে বোঝাই। তাদের মাঝখানে ত্রাণের ছোট ছোট ব্যাগের স্তুপ। চারদিক পাথার হয়ে আছে। যেদিকে তাকাও জল।

ধবলগাঁওয়ের লোকজন বসে আছে গাছের মগডালে, বাড়ির ছাদে। কয়েকদিন ধরে মাইকিং করা হচ্ছিল সবাই যেন উপজেলা সদরে যায়। সেখানে জল ওঠেনি, ত্রাণ দেওয়া হবে। কেউই যেতে পারেনি। সাঁতরে বিশ মাইল তো পাড়ি দেওয়া যায়না।

তবু গফুরের জোয়ান ছেলে জলে নেমেছিল সকালে। অন্ধকার নামলো, সে ফেরেনি। গফুরের বউ নুরমতি উচ্চস্বরে কাঁদছে। গফুর ধমক দিয়ে বললো, “থাম তো মাগি। অই দেখ ত্রাণের ট্রলার আইছে।”

সন্ধ্যার আঁধার। হ্যাজাক বাতি আর চার্জারের আলোয় ফ্যাকাসে হয়ে আছে চারদিক। তখন একটা হৈচৈ বেঁধে গেল ত্রাণভর্তি নৌযানে। কেউ জলে পড়ে গেছে, তাকে আর পাওয়া যাচ্ছেনা। ধবলগাঁওয়ের লোকজন ক্লান্ত চোখে দেখছে, যেভাবে এসেছিল সেভাবেই ফিরে যাচ্ছে ত্রাণের ট্রলার।

নিরাময় সেন 

রোদের তেজ ভয়ানক। সেই রোদের নিচে নিরাময় সেনকে হেঁটে যেতে দেখলাম আমরা সবাই। কাঁধে ঝুলছে কাঠের বাক্স। মলিন শার্ট গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে ঘামে। ডান পায়ের স্যান্ডেল কিছুটা ছেঁড়া। বাধ্য হয়ে পা টেনে সে হাঁটছে।

ভর দুপুরের প্রায় জনশূন্য আবাসিক এলাকার রাস্তায় সে চিৎকার করে করে এগিয়ে গেল। তার জুতা সারাইয়ের আহ্বানে কোন দালানের বারান্দা থেকেই ডাক এলোনা।

জরুরি অবস্থা চলছে মহামারি আক্রান্ত শহরে। আমরা এটিএম মেশিন থেকে কাঁচা টাকা উঠিয়ে নিরাময় সেনের দিকে নিরাময়হীন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। আমাদের কেন জুতো ছেঁড়েনা এই দুঃখে ক্লান্ত হয়ে ভাবলাম, “দ্রুত জেনারেল স্টোরে যাওয়া উচিত। কখন না বন্ধ হয়ে যায়।”

নতানশ ও কিদিকশ

নতানশ বললো, “বন্ধু, তুমি তো ভাল গল্প লেখো।”

কিদিকশ হাসলো, “এ আর এমন কী। খাঁটি গল্প লিখত তড়াতি। আহা, সেইসব গল্পে স্বর্গ নরক এক হয় আজও।”

নতানশ তখন রেগে গিয়ে কিদিকশকে বিশ্রি গালি দিল। কথায় কথায় তড়াতিকে কেন ডেকে আনা? এর আগেও সে দেখেছে, কিদিকশ বড় বেশি তড়াতি তড়াতি করে।

কিদিকশ – আমায় হেন গালি দিলিরে পামর?

নতানশ – দিয়েছি বেশ করেছি শুয়ার।

কিদিকশ – ফের শুয়ার বলা হচ্ছে শুয়ার?

নতানশ – সুন্দর গল্প সবাই লিখতে পারে। কুৎসিত গল্প লেখা কঠিন। পারলে তোর তড়াতিকে বলিশ একটা বাজে গল্প লিখতে।

কিদিকশ তখন আকাশের মেঘের গায়ে আঙুল দেগে দেগে একটা বাজে গল্প লিখতে শুরু করলো। যে গল্পে মেঘ উজ্জ্বল, আকাশ নীল, পৃথিবী সবুজ। কিন্তু সেই সুন্দর দেখার জন্য কোন মানুষ নেই।

গল্প লেখা শেষ হলে কিদিকশ দেখলো নতানশ কোথাও নেই। মানুষ জন্ম ত্যাগ করে সে মেঘ হয়েছে। 

দুজনে

তুপুকীনি ওর শীর্ণ কিন্তু উজ্জ্বল হাতটা বাড়িয়ে দিল জানালার ওপাশে। রাত গভীর ও অন্ধকার। নিচে রাস্তায় কাউকেই দেখা যায়না। হঠাৎ একেকটা কুকুর ডেকে উঠছে। বিছানায় পাশ ফিরলো আনোতিম। মার্চের প্রচন্ড গরমেও শীত করে উঠলো তার।

আনোতিমের আজ জন্মদিন। এই দিনটার জন্য সে অপেক্ষা করেছে বছরভর। কিন্তু তেমন বিশেষ কিছু আর কী ঘটবে? হাওয়া কেটে বাস চলছে শাঁ শাঁ করে। ভারি হয়ে আসছে চোখের পাতারা। সিটে হেলান দিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়লো।

বাবার মন অস্থির হয়ে আছে। ছেলেটার আজ ফেরার কথা ঘরে। রওনার আগে একটা ফোন তো দিতে পারতো।

উঠোনের সাদা মাটি চাঁদের আলোয় তকতক করে। দূর থেকে একটা চেয়ারে বাবাকে বসে থাকতে দেখে খুব খারাপ লাগলো আনোতিমের। পা চালিয়ে দ্রুত সেদিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু তাকে দেখে জ্ঞান হারালো বাবা।

চলে যাওয়ার আগে তুপুকীনি শব্দ করে হেসে উঠলো, “বাবা তোমাকে চিনবে কী করে? কোন উপায় রেখেছ? চিরদিন তোমার ভুলো মন।”

তখন আনোতিমের খেয়াল হল, বাসের সিটে নিজের মাথাটা ভুল করে ফেলে এসেছে সে।

পৃথিবীর আসল গল্প

এক গাধা ডোবায় পড়ে যায়। এরপর ডোবাটা গাধা হয়ে যায়। ডোবা গেল ধোপার বাড়ি। ধোপা গিয়েছিল নদীতে কাপড় কাচতে, তাকে খেয়ে নিল কুমির। কুমির তার ছেলে মেয়েদের পড়তে দেয় শেয়ালের কাছে। শেয়াল কুমিরকে গাধা বানিয়ে দেয়। সেই গাধা পড়ে যায় ডোবায়। এরপর ডোবা গেল ধোপার বাড়ি। ডোবার জলে কুমির চলে এলো। ধোপাকে কুমির খেয়ে নেয়। কিন্তু ধোপাই কুমির হয়ে যায়। ডোবাকে গাধা ভেবে গিলে নেয় কুমির। এভাবেই আসল গল্পটা শুরু হয়।

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন