আরিমাতানোর ক্রোধ ও সন্তাপ

নিয়ন্ত্রণ আমি করতে পেরেছিলাম অনেকটুকুই, যা পারিনি সেটাই কফিন, সেটাই আমার সায়ানাইড ফুল।

আরিমাতানো

তুলনায় যাবনা। তার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু বইয়ের তাকে যতবার আরিমাতানোকে দেখতাম, বারবার আমার মনে হত হুয়ান রুলফোর পেদ্রো পারামোর কথা। পারামো তার বাবার খোঁজে কোমালা নামের এক অদ্ভুতুড়ে শহরে গিয়ে থামে। মায়ের মৃত্যুশয্যা থেকে পারামোর যাত্রা শুরু হয় পৃথিবীর কুটিল জটিল রহস্যজগতে।

মাহবুব ময়ূখ রিশাদের উপন্যাস আরিমাতানো তার বাবাকে খুঁজতে কোন শহরে যায়না। কিন্তু তার জীবনে বাবার পাশাপাশি মায়েরও কোন অস্তিত্ব নেই – এই বিষাদ কালো মেঘের মত ছেয়ে থাকে। স্থায়ী মেঘ। বৃষ্টি নামানোর ক্ষমতা যাদের নেই।

একদম শূন্য থেকে রিশাদ তার আখ্যান শুরু করেন না। কিছু ভূমিকা করেন। একটা গল্প বলা হবে, এই হল ভূমিকার সারবস্তু। এরপর মূল গল্পে প্রবেশ করা যায়। আমাদের গল্প শোনায় আরিমাতানো নিজেই। যে শুয়ে আছে তার কফিনে। শুয়ে শুয়ে কফিনের গায়ে সে দেখতে পাচ্ছে এক অচেনা ফুলের নকশা খোদাই করা। সে এর নাম দেয় সায়ানাইড ফুল। কেন সায়ানাইড ফুল, বা এর তেতো ঘ্রাণটা ঠিক কিসের, শেষ পর্যন্ত আমি কিছু অনুমান করতে পেরেছি।

আরিমাতানো
প্রচ্ছদ – সিপাহী রেজা

উত্তমপুরুষে বলা যে কোন গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে এর আন্তরিকতা। যার ফলে পাঠক বর্ণনাকারীকে সহজেই আপন করে নিতে পারেন। আবার এটাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতার ঝুঁকিও বহন করে। আন্তরিকতাটা জীবন্ত না হলে, চরিত্রটা বাস্তবসম্মত না হলে পাঠকের মনে অবিশ্বাস জন্মে যায়। গল্পটায় তিনি আর একাত্ম হতে পারেন না। মানুষের মন বিচিত্র। সে গল্প ভালবাসে, কিন্তু চায় যে গল্পটা মিথ্যে হোক তবু যেন সত্যের মত লাগে। কারণ তারচেয়ে ভাল আর কে জানে, মিথ্যে করে বলা গল্পের ভিত্তিতেও লুকিয়ে থাকে সত্য।

আরিমাতানোর জীবনে আমরা পাই ভাঙা ভাঙা অস্থিরতার শৈশব। রহস্যময় পারিবারিক অতীত। তারুণ্য সে পার করে মেডিকেল ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থি হিসেবে। শুরুর কয়েকটা অধ্যায়ে যে গল্পটিকে ছাড়া ছাড়া লাগছিল, কিছুক্ষণের মধ্যে সেই ভাবটা উধাও হয়ে যায়। বুঝতে পারি যে গল্পটা আমাকে টানছে বেশ শক্তভাবেই।

যে সময়ের গল্প, সে সময়টার রাজনৈতিক টার্মোয়েল খুব মিনিমালিস্টিক কণ্ঠে আমাদের বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করেন রিশাদ। সরাসরি কোন নাম ব্যবহার না করলেও বুঝে নিতে সমস্যা হয়না তিনি কখন কার কথা বলছেন। কিন্তু এই বিষয়টা নিয়ে নিজের কিছু পর্যবেক্ষণ বলা দরকার। বাংলাদেশের ঐ সময়ের ইতিহাস পরিষ্কারভাবে জানেন না এমন যে কেউ সহজে বুঝে উঠবেন না এই মিনিমাল কণ্ঠস্বর। যদিও এটাকে বড় সমস্যা বলে মনে হয়না খালি চোখে। যতটা মনে পড়ছে -গল্পটা বাংলাদেশের, এমন কিছু কোথাও বলা নেই।

তবে সমস্যাটা হয় তখন, যখন আমরা আরিমাতানোকে ঐসব পলিটিকাল ইভেন্টে একজন সচেতন লোক হিসেবে আবিষ্কার করি। তার ব্যাকস্টোরির কোথাও দেশ বা পলিটিকাল কোন বিষয়ের সুতো ছেড়ে দেয়া নেই। সুতরাং কেনই বা সে কোন পক্ষকে গালাগাল করে, রেগে যায়, বা পক্ষ নেয় প্রথম দিকে তা কানেক্ট করতে আমার সমস্যা হচ্ছিল।

কিন্তু এই দিকটিকে যদি দুর্বলতার যায়গা বলি, সেখান থেকেই আখ্যান তার আসল শক্তি সঞ্চয় করে। এদেশের একটা মেডিকেল ক্যাম্পাসে নতুন ছাত্ররা এসে কিভাবে যে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে ভিড়ে যেতে পারে, সেই ব্যাপারটার পেইন্টিং খুব মজবুত স্ট্রোকে সেরেছেন লেখক। এবং এইসব তরুণেরা এমনভাবে পরিস্থিতির শিকার হয়, কাউকে আর সহজে ভাল বা মন্দ বলে ওঠা যায়না। সবার বসবাস একটা গ্রে এরিয়াতে চলে আসে।

উপন্যাসে অনেক মাইনর চরিত্র। কেউই বিষদভাবে চরিত্র হয়ে উঠতে চায়না আসলে। কিন্তু আরিমাতানোর কণ্ঠস্বর সবাইকেই একটা সুরে বাঁধতে চায়। বাঁধতে পারেও। সংলাপের সফল ব্যবহার ছাড়া এই কাজটা খুবই কঠিন। এসব ক্ষেত্রে হয় আপনাকে ডিটেলিং এর আশ্রয় নিতে হবে, নইলে মজবুত সংলাপ। আরিমাতানো স্বভাবতই পরেরটা বেছে নেয়। কেননা সে অস্থির। তার চরিত্রের সঙ্গে ব্যাপারটা যায়।

আরিমাতানো যেসব কাজ করে, সবকিছুকেই ইমপালসিভ মনে হয়। তাৎক্ষণিকতা সব, কোন গভীরতা নেই। অথচ তার চিন্তার জগত অতল। কেন সে এমন, এটা বুঝতে তার অতীতে আমাদের নিয়ে যান লেখক কিছু সময় পরপরই।

বাবা-মাকে খুঁজতে থাকা আরিমাতানো আসলে নিজের শেকড়টা খুঁজতে থাকে। তার মনে এই বিশ্বাস বয়সের সাথে বেড়ে চলে যে তার আসলে কোন শেকড় নেই। সুতরাং ঘটনা ও পরিস্থিতির স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেয় সে এক রকমের রাগ থেকে। তার এই ক্রোধ, অর্থাৎ বেঁচে থাকার মানে খুঁজে না পাওয়ার ক্রোধ হয়ত এই উপন্যাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য থিম।

শেষ পর্যন্ত কি নিজের জন্ম-রহস্য ভেদ করতে পারে সে? আয়নাঘরের রহস্য। দাদার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। মৃত্যুশয্যায় তার কানে কানে বলে যাওয়া দাদির অবিশ্বাস্য সব কথা। এতসব চাবি দিয়ে কি নিজের জীবনেরহস্যের গুপ্ত দরোজা ভাঙতে পারে এই যুবক? পারুক আর না পারুক, জীবনের প্রতি তার রাগ কমেনা।

বইটি শেষ করে আমার মনে হয় – আমাদের সবার মাঝেই একজন করে আরিমাতানো লুকিয়ে আছে কোথাও না কোথাও। যে সব আশাবাদ ও আনন্দকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চায় আর বলে, আমরা পৃথিবীর এক অনাহুত সন্তান। আমরা না থাকলে তার এমন কিছু এসে যেতনা।


বই পরিচিতি

আরিমাতানো

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

প্রকাশক – চন্দ্রবিন্দু

প্রকাশকাল – ২০২০

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন

প্রিমিয়াম সব লেখা ইনবক্সে পেতে নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।

অভিনন্দন! আপনার সাবস্ক্রিপশন সম্পন্ন হয়েছে।

There was an error while trying to send your request. Please try again.

এনামুল রেজা will use the information you provide on this form to be in touch with you and to provide updates and marketing.