আমাদের সময়ে শিল্প-সাহিত্যের কী প্রয়োজন

হেমন্তের এক মেঘলা সকালে প্রশ্নটির মুখোমুখি হই আমি। যখন এ মহানগরে লোকজনের ছুটবার কথা যার যার কর্মস্থলে। তারা ছুটছেও। জানালার নিচে পথের ধার ঘেঁষে বসেছে অস্থায়ী কাঁচাবাজার। ভেসে আসছে মানুষ ও যানবাহনের শোরগোল। এমন সকাল শুধুমাত্র হেমন্তের কারণেই গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষার চেয়ে ভিন্ন। আবহাওয়ার পরিবর্তন ছাড়া আর কী নতুনত্ব থাকবে সেখানে?

কিন্তু ঘুম ভেঙে ফেসবুকের ইনবক্সে পাওয়া সেই প্রশ্নটি রোজকার পুনরাবৃত্তিময় জীবন থেকে মুহূর্তে আমাকে ছিটকে ফেলে দিল। যেন এক যাত্রীবোঝাই নৌকার কিনারায় দাঁড়িয়ে ঘামছিলাম। নদীর জলে ঢেউ নেই। নৌকাটি ধীরে এগিয়ে চলেছে তীরের দিকে। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছিনা। আমাদের শুধু জানানো হয়েছে এই নৌকায় চড়ে ওপারে যেতে হবে; এমন সময় কেউ সজোর ধাক্কায় আমাকে ফেলে দিল নদীর শীতল জলে। এখনও আমি জলেই ভাসছি ঐ সকালটির পর থেকে, তীরে পৌছুতে পারিনি, তবে চেষ্টা চলছে প্রাণপন। সাঁতার যেহেতু জানি।

মেহেরাব ইফতির সেই মোক্ষম প্রশ্নটি সামনে ঝুলিয়ে এই আলাপ শুরু করব। জিজ্ঞাসাটি আপনাকেও করা যাক সম্মানিত পাঠক, “আমাদের এই সময়ে জেলখানাগুলো লেখকে ভরে নেই কেন?”  

আমার বন্ধু অসীম সরকারকে মনে পড়ছে।

মাঝারি আকৃতি, কৃষ্ণ বর্ণ। চেহারায় শিশুসুলভ সরলতা এবং কন্ঠে এক ধরণের ক্রোধ নিয়ে যে বলেছিল, “মানুষ শৈশবে কত নিষ্পাপ থাকে, বড় হতে হতে রূপ নেয় কুটিল ও জটিলে, তাইনা?”  

হ্যাঁ। তাই তো জেনে আসছি।

“রেজা শোন, কোনদিন কি তোর মনে হয়নি যে, বড় হওয়াটা ঠিক আমরা কেউই বুঝে উঠতে পারছিনা?”

সে এরপর যা বলেছিল, আজও কানে বেজে চলেছে। যেন তা পুজার মন্ডপে ঢাকের অনবরত বাজনা, আসরের ওয়াক্তে মহল্লার মসজিদে মসজিদে মুয়াজ্জিনদের কন্ঠে বেজে ওঠা আজান। এড়াবার উপায় নেই, কানে প্রবেশ করবেই। কী বলেছিল সে?

তার এক ভাইজি আছে, তিন বছর বয়স। দারুণ বুদ্ধি ঐটুকুন শিশুর। নিজের খেলনা সে অপরিচিত কোন বাচ্চাকে ধরতে দেয়না। নিজের বাবা যদি আর কাউকে কোলে নিয়েছে সে জুড়ে দেয় কান্না। এমনকি নিজের পছন্দের খাবারটি সে আর কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করতে নারাজ। কিছুটা খেয়ে ফেলে দেবে, তবু অন্য কাউকে দেবেনা। এ ঘটনাগুলোতে আমরা শিশুর সরলতা দেখি। স্বার্থপরতা দেখিনা?

বিষয়টি নিয়ে আগে কখনও ভাবারই দরকার পড়েনি। শিশুরা নিষ্পাপ ও সরল। এতে দ্বিতীয় কোন ভাবনার জাল ফেলবার দরকার আছে, তাও তো মনে হয়নি কোনদিন। অতএব, বন্ধুটির প্রশ্নে আমার মাথা ভার হয়ে ওঠে।

বই পড়ি, অফিসে যাই, বাসে চড়ি, জ্যামে সময় নষ্ট হয়, ঘরে ফিরতে রাত হয় রোজ। কিন্তু ভারি হয়ে থাকা মাথাটা আর হালকা হয়না কিছুতেই। তাহলে? এই যে এতদিন জেনে এলাম, মানুষ যত ছোট থাকে, কুটিলতা মুক্ত হতে থাকে আর বড় হয় সমাজের পঙ্কিলতার ভার কাঁধে নিয়ে। এই জানা কি ভুল ছিল?

আমাদের জেলখানাগুলো লেখকে কেন ভরে নেই? প্রশ্নটির জবাব খুঁজবার প্রথম শর্ত হল বুঝতে চেষ্টা করা, লেখকেরা কেন যাবেন জেলখানায়? তারা কি অপরাধী?

শিল্পীদের অভিযাত্রা তো সুন্দরের দিকে। জীবনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যগুলো তারা নতুন করে মেলে ধরেন আমাদের সামনে। কখনও বা মানব মনের কোন সুক্ষ অন্ধকারের বর্ণনায় ফুটিয়ে তোলেন আলোর প্রতি আমাদের যে আকুতি, সেই চিরসত্য।

তবে, এ পৃথিবী এমন শিল্পীর জন্মও দিয়েছে, যারা কেবল সাধনা করেছেন অন্ধকারের। পাঠক, আপনি কি ‘কুইলস’ নামের ছবিটা দেখেছেন? মার্কি দে স্যাড এর আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্র। যার নাম থেকে স্যাডিজম শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে।

স্যাডের বিখ্যাত বইগুলোর একটার নাম ‘দা হান্ড্রেড এন্ড টোয়েন্টি ডেজ অব সোডম’। এখন তাকে দার্শনিক, বিপ্লবী ইত্যাদি বলা হয়, কিন্তু সে আমলে ফরাসীদেশে এই লোক ছিলেন বিকৃত যৌনাচার প্রচারের কিংবদন্তিতূল্য লেখক। তো তিনি যেন আর লিখতে না পারেন, এইজন্য রাজার আদেশে তাকে জেলে নিক্ষেপ করা হয়েছিল প্রথমে। পরবর্তিকালে সেখান থেকে মানসিক হাসপাতালে।

তখনকার চার্চ নিয়ন্ত্রিত ইউরোপে রাজপরিবার কিংবা অভিজাত সমাজে অবাধ যৌনতার প্রচলন ছিলনা তা কিন্তু নয়, সেই তাদের কাছেও মনে হল স্যাড যা লিখছেন, জনগণ খাচ্ছে, এ বাড়াবাড়ি। এমন যার লেখার ক্ষমতা, যে কোন সময় তো তিনি পারেনই রাজার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে জনসাধারণকে। সুতরাং তাকে ধরে খাঁচায় পোরা হয়।

এ খাঁচাই কারাগার, স্যাড বাজে কাহিনীর লেখক হলেও তিনি তো লেখক, শিল্পী, জনতার কাছে তার দারুণ গ্রহণযোগ্যতা। সুতরাং জেল কিংবা পাগলাগারদ, সবখানেই তাকে রাখা হয় সসম্মানে, রাজার হালে। এটুকুই উদাহরণ হিসেবে থাকুক।

লেখককে জেলে কেন পোরা হয়? জেল হল বৃহৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের একটা টুলস। খুনী, ধর্ষক, ডাকাত, চোর ও বাটপার, এদের আটকের পাশাপাশি জেলের দ্বিতীয় আরেকটি উদ্দেশ্যও আছে তার কাছে। রাষ্ট্র যখন ভাবে, কোন লেখক বা শিল্পীর কাজ তার বিরুদ্ধে যাচ্ছে, অর্থাৎ ক্ষমতার বিরুদ্ধে, এই টুলসকে সে কাজে লাগায়। বাংলাদেশে কি তাও সম্ভব আজকে আর?

স্বাধীনতার পর থেকে আমরা দেখে এসেছি, জেলখানাতেই বুদ্ধিজীবী হত্যা এদেশে সম্ভব হয়েছে। আর এখন কোন লেখক তার স্বাধীন মত প্রকাশ করলে, সেটা ক্ষমতার বিরুদ্ধে যদি যায়, জেল পর্যন্ত তাকে নেবার দরকার পড়ছেনা, গর্দান চলে যাচ্ছে। ভাবুন তো, ক্ষমতা কি কখনও সমালোচনার উর্ধ্বে উঠতে পারে? ক্ষমতার নিয়মই হচ্ছে সে জেঁকে বসবে। একদিন এই জেঁকে বসায় তাকে যে সাহায্য করেছিল, ক্ষমতা সবার আগে ঘাড় মটকাবে তারই।

এমন না যে বাংলাদেশে ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রেই জমাটবদ্ধ। তা কুক্ষিগত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন গোষ্ঠি, এমনকি ব্যক্তি বিশেষের হাতেও। এই সময়ে লেখক আর জেলে যাবার সুযোগটা পাচ্ছেন না। হ্যাঁ, সত্যকথনের দায়ে তার প্রাণ ত্রাহি ত্রাহি যখন, দৃশ্যমান শেকলে বন্দী হওয়াটাকেও মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার সুযোগ।

আমাদের দেশে এখন কি সেইসব শিল্পী নেই? যারা নিত্য জীবন, সমাজ ও ক্ষমতার দর্শনের গভীরে তাকিয়ে যা কিছু বুঝতে পারেন—সেই বুঝে ফেলাটুকু অকপটে মানুষকে দেখিয়ে দেবার সাহস ও মেধা রাখেন? আমি বিশ্বাস করি আছেন। তাদের চুপ থাকবার কথা নয়, হয়ত বিস্ফোরিত হবেন (উপমাটা কেন মাথায় এলো, সামনে কখনও হয়ত আমি খুঁজে পাবো) সময়মত। কিছু ব্যতিক্রম তো সব যুগেই থাকেন, তাদের কাছে তাৎক্ষণিকতা শিল্পের একটা উপাদানমাত্র—এও মিথ্যে নয়, মানুষের প্রকৃতিগত সংকট অমর ও অপরিবর্তনশীল বলেই শিল্পও অমর। তবু খুব করে জানি, নিজের কালই লেখক পান সংকট সমাধানের জন্য। কোন টাইম মেশিন মেলেনা ভবিষ্যতে গিয়ে লিখে আসবার সহায় হিসেবে। কাল বড় ভ্রান্তিপূর্ণ এক বিষয়।

মাঝে মাঝে মনে হয়, জেল ব্যবস্থা পাওয়াটাও এখন বাংলাদেশের কোন লেখকের জন্য সৌভাগ্যের। অন্তত দিনে দুপুরে কী রাতে আততায়ীর হাতে প্রাণ দেবার চেয়ে। তবে হ্যাঁ, আমাদের সময়টা ভিতু ও চাটুকার লেখকদের জন্য এনেছে অযাচিত সুদিন। মানে, যে কারণে প্রকৃত শিল্পীর কন্ঠরুদ্ধ, একই কারণে এই চাটুকারের দল মাইক হাতে বকবক করতে পারছে।

শিল্পের যে দায় জীবন সত্যের কাছে, তার দায় প্রাণের চেয়েও বড় কিনা এ তর্ক আমাদের আজকের সময়ে অমোঘ। সাধারণ মানুষের সঙ্গে লেখকের পার্থক্য এখানেই যে। লেখকের প্রতিভাই হচ্ছে ঘটনার গভীরে লুকায়িত স্তরটি দেখতে পাওয়া, লেখকের কর্ম নিজের এই আবিষ্কার ছড়িয়ে দেওয়া পৃথিবীতে। যখন একটা সমাজে ক্ষমতা তাদের কন্ঠ চেপে ধরে, তাদের কী-বোর্ডে জমে ধুলো, সে ধুলো আসলে সাধারণ মানুষের (যারা কেবল দৃশ্যমান জগতটির উপরিস্তরটাই বুঝতে সক্ষম) দৃষ্টিকে আরও খাটো করে দেয়।

একটা মোক্ষম উদাহরণ দরকার এ প্রসঙ্গে। কী বলেন?

একটি শিশু তার চারপাশ ঘিরে রাখা বয়স্কদের যা যা করতে দেখে দেখে, সেভাবেই নিজের করণীয় ঠিক করে নেয়। শিশুর কর্মকান্ডে যদি স্বার্থপরতা থাকে, এ কারণেই তা সরলতাপুষ্ট যে শিশুটির নিজের বিবেচনাবোধ থাকেনা, প্রাকৃতিকভাবেই সে অনুকরণের মাধ্যমে তার আচার-আচরণ রপ্ত করে। আমার সেই ধ্যানী বন্ধুর প্রশ্নটিকে এভাবে আমি ধীরে ধীরে বিষদ করে তুলি, একটা পরিষ্কার জবাবের দিকে এগিয়ে যাই, সে নিজেও আমাকে সাহায্য করে।

মানুষ যত বড় হয় কুটিলতা মুক্ত হবার, সৎ হয়ে উঠবার ও নৈতিকতার একটা ধারণা নিয়ে এগিয়ে যাবার সম্ভাবনা তার বাড়ে। যে সম্ভাবনা একটা শিশুর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত হয় সমাজ ও পরিপার্শ্ব দ্বারা, একজন বয়ষ্ক মানুষের ক্ষেত্রে সেই একই সম্ভাবনার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে তার চিন্তা করবার ক্ষমতা, বিবেচনা করবার শক্তি। হ্যাঁ, একজন বিবেচক মানুষ কখনও সমাজের দোষে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন মানসিকভাবে, এই দোষে অন্যকে দুষতে পারেন না। কেননা একটি সময় যখন কদর্য্য হয়ে ওঠে, মানুষে মানুষে শত্রুতা ও স্বমেহন বাড়ে, তখনই সে সময়টির জন্য দরকার হয়ে পড়ে একজন বা কয়েকজন ত্রাতার। এই ত্রাতা কারা?

একবিংশ শতকের ‘সবকিছুতে ব্যস্ত কিন্তু প্রায় কর্মহীন’ মানুষ কি এতটা আশা করতে পারে যে, সমাজ উদ্ধার করতে আসবেন কোন মহামানব? না, সে আশা আমরা করতে পারিনা। কিন্তু উদ্ধার তো সবল বস্তুর জন্য প্রযোজ্য নয়, উদ্ধার ও পুনরুজ্জীবন প্রয়োজন পতনশীল, ভঙ্গুর বস্তু ও প্রাণের জন্যই। এবং কোন পতনশীল সমাজের উত্তরণ বাইরে থেকে কেউ এসে জাগাতে পারেনা, ঐ সমাজেই কোন একটা স্থান থেকে জন্ম নেয় উত্তরণের সম্ভাবনা। মানব জাতির ইতিহাস আমাদের সেরকমই জানায়।

পাঠক, শিল্পীর জন্ম প্রক্রিয়া আপনাদের অনুমান করে নিতে হবে। নিজের ঘরের নিভৃত কোণে বসে যে লোকটি আপনার জন্য ব্যস্ত থাকছেন পতনশীলতা ঠেকাবার মন্ত্র উদ্ধারে। মহামানব কখনও পতন ঠেকান না। একজন চিন্তাশীল মানুষ তার চিন্তাকে যখন অজস্র সাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন, তখনই উত্তরণের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। যে চিন্তাশীল মানুষ বলেন, ‘মুক্তি নির্ভর করে চিন্তার পরিপক্কতার উপরে, অপরের মঙ্গলকামনায়, সমাজ ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোকে খুলে খুলে দেখিয়ে।’

মানুষ তার নৈমিত্তিক যাপনে অস্বস্তি টের পেলেই প্রতিবাদ করে, যে রাষ্ট্রে সে বাস করে, যে সমস্ত সুবিধা তার পাওয়ার কথা তা যথাযথ না পেলেই অস্বস্তিগুলো তার চিন্তার দখল নিয়ে নেয়। কিন্তু এই অসুবিধাগুলোর পিছনে তার নিজেরই বা কতটা অবদান আছে আর পাশের বাড়ির প্রতিবেশির কতটা অবদান, এগুলো তো সে নিজে ভেবে বের করতে পারবেনা। নিজের ত্রুটিগুলোর দিকে তাকাবার জন্য আয়না প্রয়োজন। একজন শিল্পী তার রচিত সাহিত্যকর্ম, আঁকা ছবি, সঙ্গীত ও বক্তব্যে এই আত্মদর্শনের আয়নাগুলো তৈরি করেন। 

সংকটমুক্তির সংগ্রামে আর কেউ না, ব্যক্তি নিজেই সর্বাধিক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সংকটগুলো চিহ্নিত করবার কাজ শিল্পীদের। কত গুরুত্ববহ, কত বিকল্পহীন এই কাজ! 

নেই নামের এক দেশ ছিল। ছিল অন্য কোন এক সময়। সে দেশে ছিলেন একজন মাত্র রাজা। কোন মন্ত্রী নেই, সেনাপতি নেই, সামন্ত নেই। কেননা মানুষের বসবাস তো সে দেশে ছিলনা। দু’দল উট পাশাপাশি বাস করতো, এরা ছিল খাম্বাজ আর দাদরা প্রজাতির উট।

সুখে শান্তিতে চলে যাচ্ছিল তাদের। কেউ বিনা কর্মে দিন কাটাতে পারতনা। রাজ্যে নিয়ম ছিল কাজের বিনিময়ে খাদ্যের।

খাম্বাজ উটেরা রাষ্ট্রের যাবতীয় দাপ্তরিক, প্রশাসনিক ও সেবাসংক্রান্ত কাজের কর্মী ছিল।

দাদরা প্রজাতির উটেরা করত শ্রমিকের কাজ, উৎপাদন ও ব্যবসায় বাণিজ্য, বহিপক্ষের বিভিন্ন ভাড়াটে কর্মক্ষেত্রে চাকুরি।

সুখের রাজ্য বেশিদিন টিকবার নিয়ম নেই। রাজা দেখলেন, বহিপক্ষের নজর পড়েছে তার আসনের দিকে। যে কোন সময় ষড়যন্ত্র হবে আর তার ক্ষমতা যাবে চলে। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে তার মাথায় এল দারুণ বুদ্ধি।

ক্ষমতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে কারা? সরাসরি ক্ষমতার ছায়াতলে থাকা লোকেরা। রাজা হিসেব করে দেখলেন, খাম্বাজ উটেরা তার ডান হাত হলেও এরা আসলে হুমকি। যে কোন সময় বহিপক্ষ এদের ফুঁসলে তার পতনের নীলনকশা করতে পারে। একমাত্র উপায় হল, খাম্বাজরা যেন বিদ্রোহ না করে, তার ব্যবস্থা করা।

অতঃপর রাজা একদিন ঠিক করলেন, খাম্বাজ উটদের মজুরি দ্বিগুণ করে দেবেন। এ ছাড়া মুদ্রাস্ফিতি অনুযায়ি সমন্বয়ও হতে থাকবে খাম্বাজদের মজুরি নির্দিষ্ট সময় অন্তর।

কিন্তু দাদরা প্রজাতি যেমন আয় করত বহিপক্ষ’র দেয়া চাকুরি ও শ্রমের বিনিময়ে, তেমনি রয়ে গেল। না বাড়ল তাদের মজুরি, না মুদ্রাস্ফিতির সঙ্গে মজুরির সমন্বয়। ফলে হল কী, খাম্বাজ উট যারা, তাদের কর্মপরিধি কিন্তু বাড়লনা অথচ আয় হুহু করে বেড়ে চলল আর রাজ্যের গাছপালা, নদীনালা ও স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করে দেশ ভরে উঠতে লাগল প্রকান্ড সব দালানকোঠায়।

দাদরা প্রজাতির উটেরা নিয়তি হিসেবে এ অবিচার মেনে নিলেও কাজ করে চললো, তাদের অভিযোগ শোনার কেউ নেই। বরং, রাজা প্রজ্ঞাপন জারি করলেন, দাদরা উটেরা যদি আর সবকিছু বাদ দিয়ে বেশি বেশি ঘাস খেতে পারে, তাহলে খাম্বাজ প্রজাতিতে তারা নিবন্ধিত হতে পারবে। কাজ বাদ দিয়ে দাদরা তরুণদের মধ্যে ঘাস খাওয়ার হিড়িক পড়ে গেল কয়েকগুণ। 

কেউ আর খেয়াল করলোনা, দিগুণ মজুরিপ্রাপ্ত খাম্বাজ উটেরা মোটা হতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। যাদের রাস্তা দিয়ে চলতে এক গজ যায়গা লাগতো, বছর খানেক পর তাদের জন্য ছেড়ে দিতে হল দেড় গজ যায়গা। পাঁচ বছর পর দেখা গেল, রাস্তা দিয়ে কোন দাদরা উট আর চলতে পারেনা। ব্রিজ কালভার্ট, পরিবহণ সব ভরিয়ে রেখেছে মোটামোটা খাম্বাজ উটেরা।

দশ বছর পর এমন হল, মোটা হতে হতে দেশের সমস্ত যায়গা ভরিয়ে ফেললো খাম্বাজেরা। দাদরাদের বাড়িঘর পর্যন্ত গুঁড়িয়ে যেতে শুরু করলো এই ক’বছর আগেও যারা প্রতিবেশি ছিল তাদের মোটা হয়ে উঠবার আগ্রাসনে।

এক সকালে রাজা ঘুম ভেঙে দেখলেন, দাদরা প্রজাতির উট, যারা চালু রেখেছিল দেশের উৎপাদনশীলতার চাকা, পুরোপুরি চাপা পড়ে গেছে খাম্বাজদের স্থুলতার সমুদ্রে। এমনকি রাজপ্রাসাদের তোরণ ঢেকে ফেলেছে এই মোটা হয়ে চলা উটেদের শরীর।

দলে দলে উট, এতই মোটা হচ্ছে চক্রবৃদ্ধি হারে, কেউ আর কাজ করতে পারছেনা, দেশে উৎপাদন বন্ধ, বাতাসে দুর্গন্ধ, নিঃশ্বাস নেয়া কষ্ট, এমনকি বহিপক্ষও ত্যাগ করেছে রাজ্য। এমন মুহূর্তে রাজার কানে কানে এক অদৃশ্যকন্ঠ ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘নেই দেশ আজ সত্যিকার নেই হয়েছে। নিন, এবার শাসন করুন।’

মৃদু হিম ঝরতে থাকা এক বিকেলে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্পটি আমাকে শুনিয়েছিল অসীম সরকার। বলেছিল, “লেখালেখি আমি করবোনা, আজকাল কি লোকে আর পড়ে যে লিখব?” তবে আমার তো দ্বিমত ছিলই। কেননা মনে হয়েছিল বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এ গল্পটি এক সম্ভাব্য আগামীর ইশারা দেয়।

দুর্বল অনুমান করছি যে, আপনার ভ্রু কুঁচকে উঠেছে। ভাবছেন, সংকটটি নিয়ে এরচেয়েও দারুণ করে তো বলা যায়। নিশ্চিত মানি, যায় তো। যে জীবন আপনি যাপন করছেন, তার দিকে আবার তাকান।

হাতি যতই বিশাল হোক, তার কন্ঠ থেকে বেরুনো ডাকে লুকিয়ে আছে সূক্ষতম সঙ্গীত ও সংহতি। এই নতুন করে ভাবনার ইশারাটি শিল্পী ছাড়া আর কেউ আপনাকে দিতে পারবেনা, আমাদের সময়ে এমনই জরুরি শিল্প-সাহিত্যের অবস্থান।

পাঠক, ভাবুন।


লেখাটি প্রথম প্রকাশ করে ফেনী থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা শিল্পতীর্থ (একুশে সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। সে সময় এর শিরোনাম ছিল “বৃংহতি” সংহতি।

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন