বোর্হেসের স্বপ্নবাঘেরা ও লা কামপারসিতা

আর্জেন্টাইন কথাশিল্পী ও কবি হোর্হে লুইস বোর্হেস। El Hacedor (স্রষ্টা) নামের বইটি যখন প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে (যা এখন Dreamtigers নামে পরিচিত), তিনি তখন পুরোপুরি অন্ধ। বইটির লেখাগুলো বিচিত্র। কারণ এগুলো কবিতা, গদ্য স্কেচ ও গল্পের মাঝখানে থাকা সব সীমারেখা যেন মুছে দিতে চেয়েছে। লেখক নিজে বলেছিলেন, এ বইটি তার যে কোন রচনার তুলনায় খুব ব্যক্তিগত। এক তুখোড় সৃজনশীল মানুষ হিসেবে আমাদের সৃষ্টিশীলতার সীমাবদ্ধতার যে দর্শন, লেখাগুলোয় সে ব্যাপারটিই আবিষ্কার করতে চেয়েছেন বোর্হেস। Dreamtigers আমার নিজের খুব পছন্দের বই। এ বইয়ের A Dialogue About a Dialogue গল্পটি লা কোমপারসিতা নামে অনুবাদ করেছিলাম কয়েক মাস আগে। নাম গল্পটি বাংলা করতে গিয়ে আনন্দের সঙ্গে বিপদেও কম পড়া গেলনা। আশা করি পাঠকও আনন্দ পাবেন, গল্প দুটির মূল সুর ধরতে পারলে হবেন বিস্মিত।

স্বপ্নবাঘেরা

শৈশবে বাঘের ভক্ত ছিলাম আমি: জাগুয়ার নয়, নয় আমাজনিয়ান চিতা বরং এশিয়ার ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গল, যার মুখোমুখি হতে পারে কেবল হাতির পিঠে চড়া কোন যোদ্ধা। চিড়িয়াখানায় বাঘের খাঁচার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি, বিশ্বকোষ আর ন্যাচারাল হিস্ট্রির বইয়ে লেখা ওদের অসাধারণ সব বর্ণনা পড়তাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে (ওসব বইয়ে থাকা বাঘের ছবিগুলো এখনও হবহু মনে করতে পারি, অথচ অতীতে দেখা সুন্দরী রমণীদের ভ্রু কিংবা হাসি প্রায় কিছুই মনে পড়েনা আমার)।

শৈশব ফুরিয়ে গেছে, আর বাঘ নিয়ে আমার সেই নেশাও হয়েছে পুরনো, কিন্তু আজও ঠিকই ওদের স্বপ্নে দেখি আমি। স্বপ্নের মগ্নতা অথবা অস্থিরতার কোন এক স্তরে ওরা রয়ে গেছে। আর তাই, যখন ঘুম আসে, কিছু স্বপ্ন আমাকে ধোঁকা দেয়, এবং হঠাৎ বুঝতে পারি যে স্বপ্নই দেখছি আমি। অতঃপর মনে হয়: এ তো স্বপ্ন, যা আমার ইচ্ছেশক্তির এক খাঁটি বৈপরিত্য, এখন আমার অনিঃশেষ ক্ষমতা, এখন আমি একটা বাঘ তৈরি করবো।

কিন্তু পারিনা। কখনওই আমার স্বপ্ন সেই বাঘটা তৈরি করতে পারেনা যেমনটা আমি সব সময় চাই। বাঘ অবশ্য তৈরি হয়, কিন্তু যেন তা নকল, অনেক রকম প্রাণীর অবয়ব মিলেমিশে যায়, অথবা বিকট আকৃতি, কখনও বা খুবই ক্ষণস্থায়ী, কিংবা তা যেন একটা কুকুর বা পাখির মত হয়ে ওঠে।

[From the translation by Mildred Boyer]

লা কামপারসিতা

অঃ অমরত্ম নিয়ে আলাপ করতে করতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলেও বাতি জ্বালাতে ইচ্ছে করছিলনা আমাদের, অন্ধকারে কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কণ্ঠস্বরে গভীর আবেগের চেয়ে বরং এক ধরণের অসাবধানতা কিংবা ভারহীনতা নিয়ে মাসেন্দিও ফার্নান্দেজ আবার বললো, ‘আত্মা অবিনশ্বর। শরীরের মৃত্যু এমন গুরুত্ববহ কিছুনা, একজন পুরুষের জীবনে যা কিছু ঘটতে পারে মরণ সেসবের মধ্যে তুচ্ছতম।’

মাসেন্দিওর ছোরাটা নিয়ে খেলছিলাম আমি, একবার খুলছিলাম একবার বন্ধ। কাছেই এক তাবুতে কারও একরডিয়ন থেকে অনবরত বেরোচ্ছিল লা কামপারসিতা, সেই অগভীর ট্যাঙ্গোর সুর, লোকে যা পছন্দ করে কারণ তাদের বোঝানে হয়েছিল যে সুরটা পুরনো দিনের…

মাসেন্দিওকে পরামর্শ দিলাম, ‘আমাদের উচিত নিজেদের খুন করে ফেলা, তাহলে এই শোরগোল থেকে মুক্ত হয়ে নিশ্চিন্তে আলাপ চালিয়ে যেতে পারবো।’

জঃ (ঠাট্টার ছলে) কিন্তু আমার ধারণা শেষ মুহূর্তে তুমি ঠিকই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছিলে।

অঃ (গাঢ় অতীন্দ্রিয় অবস্থায় ডুবে থেকে) সত্যি বলতে, আমার মনে পড়ছেনা আসলেই আমরা আত্মহত্যা করেছিলাম নাকি করিনি।

[From the translation by Andrew Hurley]

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন