প্যানডেমিকের প্রথম ধাক্কা, ডাল্টনের বন্ড ও অন্ধত্বের সারামাগো

কোন ধরণের ভারি কথা বা চিন্তা মাথায় আসছেনা।

গতকাল রাত জেগে বন্ড এক্টর টিমোথি ডাল্টনকে নিয়ে পড়লাম। যৌবনে এই লোক অসম্ভব সুদর্শন ছিলেন। শন কনোরি বন্ড হিসেবে অবসর নেবার পর তাকেই প্রথম এপ্রোচ করেছিল প্রডিউসাররা।

ডাল্টন বলেছিলেন, ‘কোন বিখ্যাত রোলে রিপ্লেসমেন্ট ভাল আইডিয়া, কিন্তু পূর্বসূরি যদি হয় কনোরির মত কেউ, আপনাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে। পঁচিশ বছর এমন ডিসিশন নেবার পক্ষে খুবই অল্প বয়স।’

এর অলমোস্ট ষোল-সতেরো বছর পরে ডাল্টন বন্ড হিসেবে “দা লিভিং ডে লাইটস” এবং “লাইসেন্স টু কিল” সিনেমায় অভিনয় করেন। কখনই বন্ড হিসেবে তাকে পছন্দ ছিলনা আমার।

কিন্তু নতুন করে এই সিনেমা দুটো দেখা হল দিন দুয়েক আগে।

বিশেষ করে লিভিং ডে লাইটসকে এডভেঞ্চার সিনেমা হিসেবে অসাধারণ লাগলো।

এই ছবিতে কোল্ড-ওয়ার শেষ হয়ে আসার যুগটা ধরা পড়েছে, রাশান আর বৃটিশদের বন্ধুত্ব দেখানো হয়েছে। দুর্দান্তভাবে ডিল করা হয়েছে সে আমলে রাশানদের দখলকৃত আফগানিস্তানে স্বাধীনতা যোদ্ধাদের কাজকর্মকে।

পশ্চিমা কোন সিনেমায় এমন ইতিবাচক ভাবে মুসলিমদের ডিল করতে কমই দেখেছি। যদিও করাপটেড রাশান মিলিটারি অফিশিয়ালদের বিপরীতে বন্ডের হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে আফগান রেজিস্টেন্সকে পজিটিভ ওয়েতে দেখানো কাহিনীর ব্যালান্সের জন্যেও ঘটে থাকতে পারে।

পরের ছবিটা (লাইসেন্স টু কিল) দীর্ঘ হলেও সম্ভবত প্রথম সত্যিকার পার্সোনাল বন্ড ফ্লিক। লিভিং ডে লাইটসের মত ড্যাশিং না লাগলেও এই সিনেমায় ডাল্টন রাগী, হতাশ, ও সিরিয়াস বন্ড হিসেবে স্মরণীয়।

বারবার রিলেট করা যায় আমার প্রিয় বন্ড ড্যানিয়েল ক্রেইগের কোয়ান্টাম অব সোলেসের সঙ্গে। এই একটু আগেও স্কাইফল দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, বন্ড পার্সোনালিটির দিক থেকে ক্রেইগ শন কনোরির যোগ্য উত্তরসূরি, কিন্তু গল্পের দিক থেকে সে ডাল্টনের আর্কে বসবাস করে।

এ ছাড়া আর কী করবো। বাসায় অফিস করলে ছুটির দিনের আলাদা আমেজটা থাকেনা। বেলা করে ঘুম ভেঙেছে। হোসে সারামাগোর ‘অন্ধত্ব’ পড়েছি দুপুর থেকে বিকেল।

একটা শহরে আচমকা এক অসুখ শুরু হয়েছে, অন্ধ হয়ে যাচ্ছে মানুষেরা, এবং অসুখটা ছোঁয়াচে, মহামারি ঠেকাতে প্রথম ধাক্কায় দৃষ্টি হারানো একদল লোক, আর তাদের স্পর্শে আসা সন্দেহভাজন একদল লোককে কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছে এক পরিত্যক্ত মেন্টাল এসাইলামে।

এরপর যখন দু’চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো বিকেলের শেষ রৌদ্র লেগে, বুঝলাম রাতে স্বস্তির ঘুম আমার হচ্ছেনা। সেই ঘুমের অভাবে মাথা ভারি হয়ে থাকছে সব সময়।

এই যেমন এখনও। মাঝেমধ্যে এক ধরণের চাপা দুশ্চিন্তা কাজ করছে মনে। গত রাতে কিছুক্ষণ লিখেছি। আজ সারাদিন চেষ্টা করেও বসতে পারিনি টেবিলে। কিছু পরে হয়ত আবার চেষ্টা করবো।

বহুদিন আগে একবার লিখেছিলাম – জীবন হতে পারতো একটা ছুটির মরশুম। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আর দুর্যোগের ছায়া ঘনিয়ে তেমন একটা মৌসুম চলে আসবে জীবনে, কখনও ভাবিনি।

সংযুক্তি

অন্ধত্ব পড়া শেষ হয়েছিল মার্চের শেষ দিনে।

সুনীল প্রভাবিত হয়ে এই বিখ্যাত বইয়ের ক্লাইম্যাক্স অনুমানের চেষ্টা আমিও করেছিলাম।

কয়েকটা অনুমান। এবং সেসবের একটা মিলেও গেছে।

ওতে যদিও বইটির প্রতি ভালোলাগা কমেনি।

কিছু দৃশ্য আজীবন মনে থাকবে। যেমন, ডাক্তারের বউয়ের ঝুল বারান্দায় বসে কাপড় কাচার দৃশ্যটা।

গভীর রাত। অন্ধ শহরের একমাত্র দৃষ্টিঅলা নারীটি ব্যালকনীতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। তার সঙ্গে যোগ দিল আরও কয়েকজন নারী। ঘুমাচ্ছে শিশু ও পুরুষেরা। ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর উপর বৃষ্টি ঝরছে। বাতাস ও জলের শব্দ। বজ্রপাতে একবার করে আলো হয়ে উঠছে চারদিক। মৃতদেহ আবর্জনা দুর্গন্ধ দুর্দিন সব যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল ওদের সঙ্গে আমিও আছি ক্ষণিকের জন্য স্বর্গ হয়ে ওঠা সেই শীত শীত নরকের বারান্দায়।

এই বইয়ে মাল্টিলেয়ার্ড আইডিয়া কেন নেই, শুধুমাত্র অন্ধত্বের দর্শন দিয়ে মানব সমাজকে ব্যাখ্যা এক আরোপিত বিষয়, এমন অনেকে বলেন। আমার তা মনে হয়নি।

মানব সভ্যতা খুব মজবুত কোন ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে নেই এমনই মনে হয়। মহামারির এই দুঃসহ দিন না এলে আমরা হয়ত অনেকেই বুঝতাম না সেটি।

সামান্য স্কারসিটি তৈরি হলে পৃথিবীর সবচেয়ে খ্যাতিমান শহর লন্ডনের কোন শপিং মলেও মানুষ টিস্যু পেপার কেনার জন্য হাতাহাতি লাগিয়ে দিতে পারে।

বড় লেখকেরা ভবিষ্যৎ বক্তা নন। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাস, গতিবিধি ও আচরণ তারা অন্যদের চেয়ে ভাল বোঝেন।


মার্চ ২১, ২০২০
মিরপুর, ঢাকা

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন