পাস্তেরনাক এবং আহত অনুভূতির এক টুকরো ইতিহাস

ক্ষমতার চুড়ায় বসে কম্যুনিজম বা কম্যুনিস্টদেরও কথায় কথায় অনুভূতি আহত হত রাশায়। অনেক লেখকের রক্তের দাগ বরফের নিচে চাপা পড়ে গেছে সেই বিচিত্র বিশাল দেশে। কিন্তু মাইকেল বুলগাকোভ বা পাস্তেরনাকের মত বড় লেখকদের মৃতদেহের ভার তার কাঁধ থেকে কোন দিন নামবে না।

ধরা যাক পাস্তেরনাকের ডক্টর জিভাগোর কথা। এই বইয়ে অক্টোবর বিপ্লবের সমকালীন বা পরবর্তি রাশার যে চিত্র পাওয়া যায়, সেখানে কম্যুনিস্ট পার্টি দেখেছিল নিজেদের সমালোচনা। এমনকি বই যারা পড়েনাই, তারাও হুজুগে পড়ে এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।

পাস্তেরনাকের সারাজীবন ধরে লেখা এই উপন্যাস। পাণ্ডুলিপি চুড়ান্ত হবার পর রাশান প্রকাশকের কাছে পাঠানোর পরেই শুরু হয় দমন-পীড়ন। অভিযোগ এসেছিল স্বয়ং সেসময়কার রাশান লেখক উইং থেকে।

কম্যুনিস্ট পার্টির একটা আউটলাইন ঠিক করে দেওয়া ছিল, যেই আউটলাইনের বাইরে সাহিত্য করা ছিল কঠিন। সরকারের অনুগত লেখকের দল ও পত্র-পত্রিকা পাস্তেরনাকের বিরুদ্ধে জোর সমালোচনা এবং বিষোদগার শুরু করেছিল, বই প্রকাশ দূর, তা চিরতরে নিষিদ্ধ করা এবং লেখককে যেন দেশ থেকেই তাড়িয়ে দেওয়া হয় ওঠানো হয়েছিল এই দাবি।

ডক্টর জিভাগো আলোর মুখ দেখেছিল ১৯৫৭ সালে। লেখকের নিজ দেশে নয়, ইতালিয়ান ভাষায় অনুদিত হয়ে ইতালিতেই প্রথমবারের মত প্রকাশিত হয়েছিল। বহু সতীর্থ লেখক, প্রশাসন, পত্র পত্রিকার যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট পাস্তেরনাক মনের দুঃখে তৎকালীন পার্টি প্রধান ক্রুশ্চেভকে লিখেছিলেন, “জন্মভূমি থেকে আমাকে বের করে দেওয়া আর আমাকে হত্যা করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। রাশার সাথে আমার হৃদয়, আমার জীবন ও কর্ম সবই তো এক সুতোয় গাঁথা।”

১৯৫৮ সালে পাস্তেরনাককে নোবেল দেওয়া হয় সাহিত্যে। কিন্তু এ পুরস্কার গ্রহণে তার অস্বীকৃতি জানানোর পেছনে উপরোক্ত চিঠির আকুতি মিলে যায়। দেশে থাকার অনুমতি মিলবে, এর বিনময়ে নোবেল খুবই তুচ্ছ ছিল তার কাছে।

পুরস্কার ঘোষণার কিছুদিন আগে এক বন্ধুকে তিনি নিচের কথাগুলো লিখেছিলেন – “…কিছু মানুষের ধারণা এ বছর সাহিত্যে নোবেল পেতে যাচ্ছি আমি। নিশ্চিতভাবেই জানি তা গ্রহণ করতে পারবোনা, এবং জিনিসটা আলবার্তো মোরাভিয়ার হাতে যাবে। তুমি কল্পনা করতে পারবে না আমি নোবেল পেলে কত রকমের জটিলতা, দুর্দশা, ও দুশ্চিন্তার মুখোমুখি আমাকে হতে হবে। এ নিয়ে বহু লোকের ইর্ষা, আহত অহংকার আর হতাশার ফল ভোগ করতে হবে এমনকি আমার কাছের মানুষজনকেও।“

যথারীতি তাই হয়েছিল। পাস্তেরনাককে সুইডিশ কমিটি নোবেল বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করার পর সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে সোভিয়েত রাশা বিষয়টিকে ডিল করে। কেজিবি তার নজরদারি বাড়ায়, হুমকি দেওয়া হয় যে পুরস্কার গ্রহণ করলে গ্রেফতার করা হবে লেখককে, এমনকি তার প্রেমিকা ওলগা আইভিনস্কায়াকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে গুলাগ বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। আর স্টকহোমে যদি একবার পাস্তেরনাক যান, তাকে আর কখনওই রাশায় ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হবে না।

স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র এমনই হয় শেষ পর্যন্ত। কী লেখা যাবে আর লেখা যাবে না, বলা যাবে আর যাবে না, দেখানো যাবে আর যাবে না – এসবের নিয়ম নীতি ঠিক করে দেওয়া হয়। নইলে মানুষের অনুভূতি আহত হয়। যে কেউ যে কারও বিরুদ্ধে চেতনার নামে অভিযোগ দায়ের করে হেনস্থা করতে পারে। থাকে অনুভূতি বা চেতনা রক্ষার মূর্খ বা লোভী সমর্থক ও শক্তিশালী কালচারাল উইং।

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন