সেই এক পদচারি সেতু

প্রাইম মিনিস্টারের ফুলবাগানকে পাশ কাটিয়ে সেই হাইওয়েটা গিয়ে মিশেছিল বইবাগানে। শিশুদের অসুখ হলে বড়রা ওদের যে হাসপাতালে এনে ভর্তি করাতো, হাইওয়েটির এক পাশে ছিল সেই আরোগ্য নিকেতন।

খুব ব্যস্ত সড়ক। প্রচুর গাড়ি হেঁকে যেত, ভারি ও হালকা। রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটতো।

শিশুকে ভর্তি করতে এসে বাবা-মা মরতো, ভাইকে দেখতে এসে বোন, নাতিকে দেখতে এসে দাদা-দাদি।

এমনকি স্বয়ং শিশুরাও কেউ কেউ ঐ রোডে গাড়িচাপা পড়তো আর বেহেশত থেকে ড্রাইভারদের গায়ে মুতে দিত। খোলা টং দোকানে চা খেতে গিয়ে অবুঝ ড্রাইভারের দল ভাবতো শিশির কণা বা বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে তাদের কাপে।

জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ওভারব্রিজ চাই। শহরের মেয়র, এমপি ও যোগাযোগ মন্ত্রী সবার কানেই সেই দাবি পৌঁছে গিয়েছিল। তারা কেউ এই নরক হয়ে ওঠা সড়কের উপর ওভারব্রিজের বিষয়টায় দ্বিমত করতেন না।

সব সময় বলতেন, ‘চলমান সিঁড়িঅলা ওভারব্রিজ দুই মাসের ভিতরে তৈরি হয়ে যাবে। কাউকে আর সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হবেনা উপরে, আরামে ও নিরাপদে লোকজন রাস্তা পার হবে’, ইত্যাদি।

তবে দুই মাস আর কোনদিন শেষ হতোনা। তারপর দেখা যেত যে, বহু বছর গড়িয়েছে আর সরকারও বদল হয়ে গেছে। নতুন সরকারের লোকজন একই আশ্বাস দিলে জনগণ ভেবে নিত ওভারব্রিজ আর হবেনা। কেউ না কেউ প্রতিদিন আহত বা নিহত হবেই, এটা রোজ হাশরের আগের দিন পর্যন্ত চলবে।  

কিন্তু আধুনিক যুগ নামের একটা যুগ মানুষকে প্রতিবাদি হবার সুযোগ দিয়েছিল, যে কারও অভিযোগ মুহূর্তে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌছে যেত।

কোন এক শীতের দুপুরে বাইক থামিয়ে সেই হাইওয়ের পাশে ম্যাঙ্গো জুস কিনতে নেমেছিল একজন সোশাল মিডিয়া অবতার। কুখ্যাত ঐ রাস্তায় মানুষের দুরবস্থা নিজের চোখে দেখে নিজেকে সে ধিক্কার দিল। এমন বিষয়ই তো চাই। এতদিন কেন তার চোখে পড়েনি?

পরের দিনই লাইভ করতে এসেছিল সে। ট্রাইপডে ক্যামেরা বসিয়ে হাত-মুখ নেড়ে উচ্চকণ্ঠে বলে যাচ্ছিল যে কীভাবে নিয়ম না মেনে এই রাস্তায় বাস থামানো হয়, ড্রাইভাররা মানুষ দেখেও গতি কমায়না, ট্রাফিক পুলিশ আছে নামেমাত্র।

তুখোড় চলছিল। হঠাৎ পর্দার ওপাশে লাখ লাখ মানুষের চোখের সামনেই অবতারের উপর চাকা তুলে দিল যাত্রীবোঝাই এক নীলচে লোকাল বাস। 

সেলেব্রিটির মৃত্যুটি শাপেবর হয়ে এলো জনগণের জীবনে। সোশাল মিডিয়ায় টানা এক সপ্তাহ আর কোন ইস্যুকে পাত্তাই দিলনা তার ভক্তরা।

রাস্তায় মিছিল হল, মানববন্ধন হল, এমনকি প্রাইম মিনিস্টারের ফুলবাগানের সামনে গিয়েও তারা সমস্বরে গান গাইলো, ‘সবকটা জানালা খুলে দাওনা…’  

নেটিজেনরা অগ্নিবর্ষি সব স্টেটাসে ঐ রাস্তাটিসহ সারাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলো। এর মাঝে একদল লোক আবার ঐ সেলেবের বিপক্ষে বলতে শুরু করলো। তিনি নাকি লোক তেমন সুবিধার ছিলেননা।

কেউ হয়ত খেয়াল করেনাই, তবে দেশবিরোধী চক্রের সঙ্গে তার আঁতাত ছিল, অনেক স্টেটাসেই এর প্রমাণ মেলে। যেমন তার এক লেখা আছে, ‘স্বাধীনতা হল বইয়ের দোকানে মানিব্যাগ ভরা কাঁচা কাঁচা টাকা, স্বাধীনতা মানে পাস্তার পরে নির্ভার দিলে পিৎজার অর্ডার…’

স্বাধীনতার মত মহান আত্মত্যাগ ও মুক্তির চেতনা সমৃদ্ধ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা শব্দটিকে টাকা, পিৎজা আর পাস্তার মত তুচ্ছ বিষয়ের সঙ্গে তুলনা দেওয়াটা কিসের অভিসন্ধি? সেলেব চৈনিক বাম নয় তো? আর দিল শব্দটা তো উর্দূ, এ নিশ্চয় সেই পুরনো শকুনদের উত্তরাধিকারি হবার ইশারাই দেয়? 

তবু রাজা হলেন জনতার ছায়ামূর্তি, এই দার্শনিক সূত্র মেনে নিয়ে প্রাইম মিনিস্টার ঘোষণা দিলেন ঐ রাস্তার উপরে ওভারব্রিজ হবে। বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করা তো চাই। তিনি সংশ্লিষ্ট মহলকে নির্দেশ দিলেন দ্রুত যেন কাজ শুরু হয়।

আর কারও আশ্বাসের দরকার পড়লোনা। উত্তেজিত জনতা সোশাল মিডিয়াতে প্রাইম মিনিস্টারের ছবির বন্যা বইয়ে দিল। চারদিকে ধন্যধন্য মিঠে শব্দের ছড়াছড়ি।

যথাসময়ে কাজ শুরু হয়ে যায়। ওভারব্রিজ তৈরি হতে থাকে। লোকে দেখে আনন্দ নিয়ে। পিলার বসলো, লোহার খাঁচা, সিমেন্টের দানবীয় সব ট্রাক। দিনরাত কাজ হয়, হলো। তিন মাসের মধ্যে আর কোন দুর্ঘটনাও ঘটেনা, ঘটলোনা।

অতঃপর মানুষের চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে গেল জিনিসটা। কাছ থেকে বা দূর থেকে যেভাবেই তাকানো হোক, একশ’ বছর আগে বৃটিশদের তৈরি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মত দেখায় ওটাকে।

জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যাক। একটা গতি হল। চলমান সিঁড়ি কে চেয়েছে? এই ম্যানুয়াল ওভারব্রিজেই চলবে তাদের। আবার দেখো, কেমন দৃষ্টিনন্দন লাগছে।

এলো মাত্র ক’টা দিন অপেক্ষার পালা। ওভারব্রিজ প্রস্তুত, প্রাইম মিনিস্টারের এত সময় নেই, তবে যোগাযোগ মন্ত্রী আসবেন উদ্বোধন করতে। ফিতে কাটবেন। নিজে পার হবেন সবার আগে। তিনি পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাবেন, নাকি পশ্চিম থেকে পুবে, এই নিয়েও জনগণের মধ্যে বেশ আলাপ-আলোচনা চললো।

দু’দিকের সিঁড়িতেই বেরিকেড দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনের জঙ্গল থেকে কাঁটাঝোপ কেটে এনে বাধা সৃষ্টি করা হলো উঠবার মুখটায়। উদ্বোধনের আগে তো আর সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া যায়না এত বড় ও বিখ্যাত একটা স্থাপনা। যদিও শ্রমিকেরা ওঠে। তারা রঙ করে। শেষ মুহূর্তের ফিনিশিং দেয়।

বিলম্বের কারণে অনেকেই কানাঘুষা শুরু করলো এক সময়। মন্ত্রী আসেনা কেন? আজব তো। এ কি মগের মুল্লুক? দিন যায়, রাত পার হয়। ব্রিজ খুলে দেওয়া হয়না। কাঁটাঝোপ আর বেরিকেডও সরেনা। তবে লোকজন নিশ্চিত ভেবে নেয় কিছুদিনের ভেতরেই মন্ত্রী আসবেন। ফিতে কেটে পূর্ব থেকে পশ্চিম বা পশ্চিম থেকে পূর্বে যাবেন।

গ্রীষ্মের খরতাপ থেকে বর্ষায় ভেজে ব্যবহারহীন লৌহ স্থাপনা, চলে আসে শীত। ওটার দিকে চেয়ে থেকে তারা রাস্তা পার হয়। দুর্ঘটনার পরিমাণ কমেনা।

এর মাঝেই কিছু উদ্বাস্তু পরিবার এসে সেখানে সংসার পাতে, বেরিকেড থাকা সত্ত্বেও ভাসমান, নোংরা ও গায়ে ধুলো পাঁচড়াঅলা এই নারী-পুরুষ-শিশুদের দল কীভাবে উপরে ওঠে লোকে ভেবে পায়না।

ভাগ্নির ব্রংকোনিউমোনিয়া চিকিৎসার সময় যে বালিকাটি শহরে এসে ওটাকে দেখেছিল, কয়েক বছর পর নিজের বাচ্চার কাটা ঠোঁটের অপারেশন করতে এসেও একই রকম ওভারব্রিজটিকে সে রাস্তার উপর আড়াআড়ি এক বিষণ্ণ দানবের মত ঝিমিয়ে থাকতে দেখে।

মন্ত্রী কবে আসবেন? এই ব্রিজ কি উদ্বোধন হবেনা? এই প্রশ্নও ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে মুছে যায় মানুষের মন থেকে।

এক সময় লোকে ভুলে যায় যে ওখানে একটা পদচারি সেতু তৈরি হয়েছিল। কারণ জিনিসটার অস্তিত্ব ঢেকে ফেলে উন্নয়নের বাণীতে ভরে থাকা বড় বড় সব প্ল্যাকার্ড আর পোস্টার। বিশাল ব্যানার থেকে প্রাইম মিনিস্টার হাত উঁচু করে জনতাকে তার হাসিমুখ দেখাতে থাকেন।

সময় কত দ্রুত চলে যায় কেউই বুঝে উঠতে পারেনা।

এরও অনেক বছর পর ক্ষমতায় তার দুই যুগপূর্তি উৎসবে সারাদেশকে রঙিন আলোয় সাজিয়ে তোলার নির্দেশ দেন প্রাইম মিনিস্টার। লোকজন প্রায় রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে থাকে সেই মহা উদযাপনের।

উৎসবের প্রথম দিনটিতে পদচারি সেতুর বড় এক অংশ ভেঙে একটা কিন্ডারগার্টেন মিনিবাসের উপর পড়লে সকল যাত্রীসহ গাড়িটা প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে যায়।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শিক্ষাসফরে যেতে থাকা একদল শিশুর এমন নির্মম মৃত্যুতে সারাদেশে আড়াই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন প্রাইম মিনিস্টার।


[রচনাকাল – ১২ই সেপ্টেম্বর ২০১৯]

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেইল ব্যবহার করুন