নিজের থেকে দূরে

..প্রথমে ভাবছি ধরতে পারবোনা এমন আশংকার চাদর পরা এক ট্রেনের কথা। নগরে হুড়মুড়িয়ে শীত নেমেছে দুদিন হল, এই শীত থেকে আরও গভীর শীতের দিকে যেতে চাইব। দিন চারেক আগে যেমন হিম কেটে কেটে বসছিল চুলে চোখে আর মুখে, পদ্মায় এক ফেরির ছাদে জড়োসড়ো বসে থাকা অনেক মানুষের থেকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে চেয়ে ছিলাম অলৌকিক চরগুলোর দিকে, জন্মের পর থেকেই যেসব চরের মাটি ভরে ভরে উঠেছে পিপাসা, রক্ত আর রজনীর নিশ্ছিদ্র রহস্যের কুয়াশায়। শৈত্যপ্রবাহের মৌসুমে একই সঙ্গে জীবন আর মৃত্যুর মিশ্র আরক প্রতিনিয়ত পান করি আমরা চায়ের কাপে, বদ্ধ কামরায়, কাঁচভাঙ্গা জানালার নিচে লেপের ওমে। দ্বিতীয়ত ভাবছি যমুনার তীরবর্তি এক আধোগ্রাম আধো শহরের কথা। বন্ধুর আঁকা ছবিতে যেই লোকালয়ে খুলে গিয়েছিল কোন অন্য জগতের ছোট্ট দুয়ার যা সন্ধ্যা হবার আগে আগে উন্মুক্ত হয় আর রাতের শেষ প্রহরে হয়ে যায় বন্ধ। অন্ধকার আর কুয়াশামোড়া সেই জনবিরল প্রহরে ট্রেন থেকে নেমে কি আমার মনে হবে কোথায় এসে পড়লাম? আমার ব্যাগে তখন ঘুমিয়ে থাকবে একটা বাড়তি উলের চাদর, আর ‘বর্বরদের জন্য অপেক্ষা’ নামের এক ছোট্ট জাদুকরি বই। মানুষ যত দূরেই যাক নিজের থেকে, নিজেকে ছেড়ে যাওয়ার আকাংখ্যা তার অফুরন্ত, অনিঃশেষ। মানুষের জন্য আমার মায়া হয়..

এই শহরের চা’অলাদের নিয়ে একটা বাড়তি আগ্রহ ছিল আমার।

এত এত মানুষ তার দোকানের বেঞ্চে এসে বসে, আড্ডা মারে, ঝগড়া করে, রসের আলাপ কী পলিটিকস। গুজব।

একটা সময় মনে হত, চা’অলাদের সঙ্গে কথা বলাটা নিশ্চয় এক দারুণ ব্যাপার। ওদের সঙ্গে আলাপ মানেই একটা মহল্লার বিবিধ প্রকাশ্য-গোপন আমার করতলে।

ইন্টারমিডিয়েটে যখন ভরতি হয়েছি, নিউমার্কেট এলাকার যে কোন চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারাটাকে রীতিমত সিনেমাটিক লাগত।

কিন্তু একটা ব্যাপার ঠিকই বুঝতাম। দিনের পর দিন চা খেয়ে গেলেও কোন চা’অলার সঙ্গেই আমার ভাব জমছেনা।

একদিন এক বন্ধু বললো, ‘সিগারেট আসল রহস্য। টানা তিন চারদিন কোন টং দোকানে রেগুলার গিয়ে সিগারেট নিবি চায়ের আগে। তাহলে দেখবি চিনে রাখবে তোকে।’

এই টোটকার কী রহস্য তা জিজ্ঞেস না করেই আমি প্রয়োগে চলে গেলাম।

সিগারেট খাইনা। তাতে কী। মাঝেমধ্যে তো খেতে হবে। এক চায়ের দোকানে গিয়ে দিন কয়েক চায়ের আগে সিগারেট নিতে শুরু করলাম। বন্ধুর কথা মত হলনা কিছুই।

দোকানে গিয়ে বলি মামা, ‘সিগারেট দাও।’ প্রতিদিনই মামা বিরক্ত মুখে জিজ্ঞেস করে, ‘কী ছিরগেট দিমু?’

অথচ এমনও দেখেছি কবে এক বন্ধু এসে আমার মহল্লার দোকান থেকেই চা সিগারেট খেয়েছে। বহুদিন পর তাকে নিয়ে আবার গিয়েছি। চা’অলা ওকে দেখে হেসে বলছে ‘মামা তো গোললিফ খান? চিনি ছাড়া চা, ঠিক না?’

এক সময় এই ব্যাপারটা মেনে নিলাম। মনে হতে লাগল যে, আমার এপিয়ারেন্স সম্ভবত বৈশিষ্ট্যহীন। মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়। আমি ঠিকই মনে রাখি। আমাকে দেখে অনেকেই মনে রাখতে পারেনা।

এই দুঃখ অবশ্য ঘুচিয়ে দিল গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের এক যমজ ভাই। কলোম্বিয়া থেকে হাজার মাইল দূরে মিরপুর সি ব্লকে তার বসবাস। রিকশা চালায়।

এনার সঙ্গে খাতির হয়ে গেল। নিজে থেকেই নানান কথা বলেন। আমি অবাক হয়ে ভাবি মার্কেস হবহু এইরকম দেখতে, তবে আরও খাটো হবেন উচ্চতায়। মিরপুরের মার্কেস বেশ লম্বা, দীর্ঘদেহী।

তার জাদুবাস্তবতায় আমি ঢুকে গেলাম। দেখলাম যে আর কারও সঙ্গেই আলাপের ইচ্ছা করছেনা।

ঢাকা শহরের ইদানীংকার চা’অলারা অধিকাংশই নতুন, সেই মহল্লাগন্ধী বিষয়টা আর তাদের মাঝে নেই। এপার্টমেন্ট হাউজের পাহারাদারের মত তারাও নিজেদের রোড ছাড়া আর কোন কিছুই তেমন চেনেনা।

না চাওয়া শুরু হতেই দেখলাম তারা আমাকে মনে রাখতে শুরু করেছে। অন্য কারও সঙ্গে বসে কথা বলছি। সেই আলাপে ঢুকে পড়ছে নাক গলিয়ে।

এমনকি গেল শীতে শহর থেকে দূরে আরও শীত পড়েছে এমন কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে হল খুব। ঢাকাতেই শৈত্যপ্রবাহ তখন। বন্ধু হামিম কামাল আর পার্লিয়া ভাবি বললো, ‘যা খুঁজছো, তার সন্ধান পেতে তারাকান্দির চেয়ে মোক্ষম যায়গা আর হয়না।’

ওদের নিমন্ত্রণে আবেগাপ্লুত হয়ে অফিসের নিচে চায়ের দোকানে গেলাম। রঙ চা খেতে খেতে দু’জন কলিগকে বলছি, ‘আজ যমুনা এক্সপ্রেসে উঠছি বিকেলে।ঢাকা থেকে অনেক দূরে রিমোট একটা যায়গায় যাব। থাকব দুদিন।’

‘আসলেই রিমোট নাকি?’

‘হ্যাঁ, তাই তো জানি। দিনে কুয়াশা। রাত নামলেই ঘন গাছপালায় মোড়া রহস্য। কিছুদূর হেঁটে গেলেই নদী।’

এই আলাপে নাক ঢুকিয়ে দিল অচেনা এক লোক। রীতিমত আহত স্বরে বললো, ‘তারাকান্দি যাবেন? এ তো শহর। সবকিছু আছে। রিমোট বলছেন কেন? রিমোট তো না।’

কলিগদের সামনে মুহূর্তে যেন একটু অপ্রতিভ হলাম। ওরা অন্য কিছুতে মনযোগী হলে লোকটার দিকে এগিয়ে গেলাম।

‘রিমোট না বলছেন? রহস্য নাই?’

‘আরে ভাই, আমি তো ঐখানে থাকি। হ্যাঁ, ঢাকার মত না। কিন্তু এত আবার ব্যাকডেটেডও না। রিমোট তো মোটেই না। আপনি সব কিছু হাতের নাগালে পাবেন। মডার্ন যায়গা।’

কী অর্থে পাখি ডাকা, ছায়া ঢাকা আর রহস্যেমোড়া যায়গা বলে ভাবছিলাম তারাকান্দিকে, তা আমি লোকটিকে বোঝাতে পারলাম না।

তবে ভরসা ধরে রাখলাম বন্ধুদের কথায়। ওরা যখন বলেছে যায়গাটা ঠিক তেমন, যেমন আমি চাই – তো তাই হবে।

এক আলো মরে আসা সন্ধ্যায় যমুনা এক্সপ্রেসে উঠে আমি কোন আসন পেলাম না। সে ধীরেসুস্থে চলতে থাকলো। আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল, সাপের মত সুদীর্ঘ যানটি নিশ্চয় জানতো।

শুধু একটা দৃশ্যের কথা বলি।

ট্রেন জামালপুর পার হল। একেবারে পেছন দিকের কামরা থেকে নেমে আমি দু’হাত ঘষে গরম করতে চেষ্টা করছি। সামনে তাকিয়ে দেখি গাঢ় অন্ধকারে ট্রেনের চোখ জ্বলছে। ইঞ্জিনটা প্রায় মুড়ে আছে কুয়াশায়। হলুদ আলো জ্বলছে ট্রেনের সামনের দিকের কামরাগুলোয় আর, জনশূন্য, যাত্রী নেই। একটা বিশাল ফাঁকা ট্রেনে রাতের অন্ধকার কেটে কেটে যাচ্ছি। কিছুটা ভুতুড়ে। কিছুটা বিষণ্ণ।

যমুনার তীর ঘেঁষা সেই রূপালী পৃথিবীর কথা আমি অন্য কোথাও বলবো।

তবে যোগাযোগের ব্যর্থতার এক গল্প থেকে এই গল্প আমাকে কোথায় নিয়ে এলো ভাবছি।


প্রচ্ছদ চিত্র – জাহরা জাহান পার্লিয়া

[রচনাকাল – ২৮ জুলাই ২০২০]

প্রথম প্রকাশ – পেন্সিল চতুর্থ বর্ষপূর্তি সংখ্যা ২০২০

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন