দ্যা সিমপ্যাথাইজার ও আধুনিক যুদ্ধ-উপন্যাসের দাবি

দ্যা সিমপ্যাথাইজার যুদ্ধজাত উপন্যাস।

ভিয়েতনামিজ-আমেরিকান উপন্যাসিক ভিয়েত থান নুইয়েনের এ আখ্যান ভিয়েতনাম যুদ্ধকে নিয়েছে পটভূমি হিসেবে, আখ্যানের মূল চরিত্র একজন গুপ্তচর।

ইতিহাসের পাঠ ও আমাদের বিবেচনাকে বইটা বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কীভাবে, তা নিয়েই এই আলাপ।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের উপর কোন উপন্যাস পড়তে হলে এ বিষয়ে সামান্য ধারণা রাখা জরুরি।

আমি বিস্তারিত বর্ণনায় যাবনা। একটা সারফেস লেভেলের আউটলাইন দেয়া যাক।

এর সুত্রপাত ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৪ সনের প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধ। যেখানে ভিয়েতনাম ফ্রান্সের ঔপোনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তিলাভের জন্য সংগ্রামে নামে। স্বাধীনতা লাভ করে।

তবে স্বাধীন ভিয়েতনাম অভিন্ন রাষ্ট্র না হয়ে দু’ভাগে বিভক্ত হয় – দক্ষিণ ও উত্তর ভিয়েতনাম।

উত্তর ভিয়েতনাম সাম্যবাদী ভিয়েতনাম বা সোশালিস্ট আদর্শে গঠিত হয়। দক্ষিণ ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠা পায় গণ – প্রজাতন্ত্র হিসেবে।

এই হল সংক্ষিপ্তসার: ১৯৫৯-এ শুরু হওয়া দুই ভিয়েতনামের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণের পক্ষে সরাসরি অংশ নেয়। তাদের ভয় ছিল ভিয়েতনাম এক হয়ে গেলে সমাজতন্ত্র দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়াতে চুড়ান্ত বিজয় লাভ করবে।

সোভিয়েত রাশিয়া ও অন্যান্য সাম্যবাদী রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধে নামে উত্তর ভিয়েতনামের পক্ষে। রাশান-মার্কিন কোল্ডওয়ারের একটা বড় অংশ বলা চলে একে।

এ দীর্ঘস্থায়ি যুদ্ধকে মার্কিনীদের এক অপরিমেয় ক্ষতি হিসেবেও দেখা হয়। কেন? সেটি সামনে কিছুটা খোলাসা করতে চেষ্টা করবো।

যুদ্ধের নিয়ম। অজস্র প্রাণহানি ঘটে। ১৯৭৫ সনে এক হয়ে যায় দুই ভিয়েতনাম।

উপন্যাসের নামহীন ন্যারেটর একজন রাজনৈতিক কারাবন্দী যে ভিয়েতনাম যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে চলে।

যুদ্ধের একজন অংশগ্রহণকারি ছিল সে। যার প্রধান সংকট নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও কাছের মানুষদের প্রতি বিশ্বস্ততার দন্দ্ব।

যুদ্ধ মানেই মৃত্যু, যুদ্ধ মানেই শক্তি ও জীবনের অপচয়, এর মাঝে আটকা পড়া আম জনতার অর্থহীন বিলুপ্তি – সমস্ত কিছুই উঠে আসে তার জবানীতে।

তবে উপন্যাসের একটা লাইন থেকে এর থিম সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে ভাল অনুধাবন আসবে: যুদ্ধ হয় দু’বার। প্রথমটি ময়দানে, দ্বিতীয়বার হয় স্মৃতিতে।

ঘটনার শুরু দক্ষিণ ভিয়েতনামের সাইগন-এ (হো-চি-মিন সিটি)। সময়টা এপ্রিল ১৯৭৫।

উত্তর ভিয়েতনামের জনগণ দেখছিল এক অভিন্ন সোশালিস্ট ভিয়েতনামের স্বপ্ন। সুতরাং মার্কিনপন্থি পুতুল সরকারের রাজধানী সাইগনের পতন এগিয়ে আসছিল ভিয়েত কং আর পিপলস আর্মি অব ভিয়েতনামের হাতে।

এই গৃহযুদ্ধমুখর পরিবেশে আমরা দেখি একজন আর্মি জেনারেল তার বিশ্বস্ত ক্যাপ্টেনের সহায়তায় তালিকা তৈরি করছেন কারা কারা সাইগন থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ ফ্লাইটে দেশ থেকে পালাতে পারবে।

এরপর দেখা যায়, জেনারেল ও তার নিকটজনেরা ইউএসএ’র লস এঞ্জেলেসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে নতুন জীবন শুরু করেছেন। জানতেও পারছেননা তাদের গতিবিধির উপরে নজর রাখছে জেনারেলের একান্ত বিশ্বস্ত ওই ক্যাপ্টেন। গোপনে তথ্য পাচার করছে সাম্যবাদী ভিয়েতনাম সরকারের কাছে।

দ্যা সিমপ্যাথাইজার মূলত এই ক্যাপ্টেনের গল্প। যার জন্ম হয় একজন অচেনা ফ্রেঞ্চ পিতা ও দরিদ্র ভিয়েতনামিজ মায়ের সংসারে। যে ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকায় পড়তে আসে, কিন্তু ১৯৬৫ সনে আমেরিকান সরকারের চাপে যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য হয়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে হয়ত এটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডী। অজস্র মার্কিন তরুণকে বাধ্য করা হয়েছিল এই যুদ্ধে যোগ দিতে।

উপন্যাসের নায়কের মনস্তত্বে আমেরিকান প্রশাসনের প্রতি বিরূপ মনভাবের সূচনা এখান থেকেই আসে কি না প্রশ্ন জাগতে পারে। আবার লেখক যখন সাংবাদিক এলেক্স ডুবেনের সাথে এক সাক্ষাৎকারে জানান, “এ আখ্যান নিরপেক্ষ নয়, পক্ষ অবশ্যই অবলম্বন করে। আর সেটি হচ্ছে ন্যায়ের পক্ষ।”

ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে আমেরিকানরা যে ভুল তথ্য প্রচার করে এর কড়া সমালোচনা করে নুইয়েন বলেন:

আশির দশকে যুদ্ধের ওপর নানান সিনেমা বানিয়ে হলিউড আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে একজন আমেরিকান তার মতো করে গল্প বলে, ইতিহাস বিকৃত করে এবং ঠিক করে দেয় গল্পের কেন্দ্রে কে থাকবে আর প্রান্তে কার অবস্থান।

আমি আমেরিকান সংস্কৃতির নিজের মতো করে গল্প বানানোর ক্ষমতার কথা তো জানিই, বরং এ-ও জানি কীভাবে তারা সেসব গল্প পৃথিবীময় প্রচার করে।

আপনারা জানেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা পরাজিত হয়। কিন্তু তাদের লেখা ফিকশনের দিকে একবার তাকান, দেখবেন তারা সারা বিশ্বে যুদ্ধের গল্প নিজেদের মতো করে প্রচার করেছে।

ভিয়েতনামিজরাও যুদ্ধের গল্প বলে কিন্তু সেগুলো বিশ্বময় প্রচারের সামর্থ্য তাদের নেই।

এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিই।

ফিলিপ কাপোটা নিউইয়র্ক টাইমসে আমার বইটির ওপর একটি চমৎকার আলোচনা লিখেছেন। কিন্তু লেখায় অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয় নিয়ে আমার ঘোরতর আপত্তি আছে। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘এই উপন্যাসটি যারা বাকরুদ্ধ তাদের বাকস্বাধীনতা দিয়েছে।’

আমি শ্রদ্ধাভরে বলতে চাই, ভিয়েতনামের মানুষের বাকস্বাধীনতা আছে। হয়তো আমেরিকানরা বধির, তাই তারা শুনতে পায় না।

দ্যা সিমপ্যাথাইজার সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় ও ভিয়েতনামের বিজয়গাথা বর্ণনা করা নিউয়েনের উদ্দেশ্য হয়ে থাকেনি। বরং কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক এ সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তুলে তিনি দিতে চেয়েছেন পাঠকের হাতে।

একটি যুদ্ধে দু’পক্ষই প্রচার করে তারা ন্যায়ের পক্ষে লড়ছে। কিন্তু ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষেরা ঠিক কোথায় অবস্থান করে? মানবতার এ দুর্যোগের বর্ণনা তাই দ্যা সিমপ্যাথাইজারের সমস্ত পাতা ভরে তুলেছে এক আবেদনে – যুদ্ধ কখনই ন্যায় আনেনা, যুদ্ধ বিরোধীতাই ন্যায়।

ভিয়েত থান নিউয়েন নিজেও এ যুদ্ধের একজন ভুক্তভোগী। জন্ম নেন ১৯৭১ সনে, ভিয়েতনামে। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ওই ১৯৭৫ সনেই বাবা-মার সঙ্গে আমেরিকায় পালিয়ে আসতে হয় তাকে।

ফোর্ট ইন্ডিয়ানা টাউন গ্যাপে তিনবছর কাটে রিফিউজি ক্যাম্পে। যে জীবনের বর্ণনা তিনি দিয়েছেন নিজের প্রথম উপন্যাসে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মূলত সেটি তার আত্মজৈবনিক উপাদানেও সমৃদ্ধ।

সমালোচকেরা দ্যা সিমপ্যাথাইজার (সহমর্মী) সম্পর্কে এক বাক্যে এটাই বলছেন যে, এ উপন্যাস মূলত ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে এদ্দিনকার মার্কিনী ফোপোরদালালির বিরুদ্ধে একটা শক্ত প্রতিবাদ কিংবা দীর্ঘকালের ভুয়া দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি একটা মোক্ষম জবাব।

আজকের দিনে যুদ্ধের উপন্যাস এমনই হওয়া উচিত, চাপিয়ে দেওয়া মতের চেয়ে যেখানে প্রাধান্য পাবে নৈর্বক্তিক দৃষ্টিতে দেখা ইতিহাস, যা নিরঙ্কুশভাবে পক্ষ নেবে মানবতার।

রচনাকাল – ২০১৭

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন