পাবলিক সেন্টিমেন্ট নিয়ে রাষ্ট্রীয় খেলাধুলার সহজ কৌশল

রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া বা চতুর সেলেব্রিটিগণ কিভাবে জনগণকে যা ইচ্ছা তাই করাতে পারে?

কোন ধরণের অবিচার বা অনিয়ম নিয়ে ইয়ার্কির ইশারা দেওয়া হয়। মানে ঐ জিনিসটাকে কোন একভাবে ফানি পয়েন্ট অব ভিউ থেকে তুলে ধরা হয় পাবলিকের সামনে।

এর একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে পপুলার আমেরিকান টিভি শো স্যাটারডে নাইট লাইভের একটা ফান সেগমেন্ট থেকে।

যেখানে দেখানো হয়: আলাদিন আর জেসমিন জাদুর গালিচায় উড়ছে।

আলাদিন খুব খুশি। কিন্তু জেসমিন একের পর এক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। সারস এসে তার মুখে পায়খানা করে দিচ্ছে। বিমানের টয়লেট তার গায়ে ফ্ল্যাশ হচ্ছে, ইত্যাদি।

আলাদিন ওসব খেয়াল করছেনা, প্রেমের কথা বলে যাচ্ছে। পর্দার পেছন থেকে আসছে সেই চিরাচরিত হোহো হাসির আওয়াজ।

এরপর বিব্রত জেসমিনের মাথায় একটা বোমা পড়লো। ভয়ে জাদুর গালিচায় বসেই পেশাব করে দিল জেসমিন।

আলাদিন বললো, ‘ওহ, খেয়াল করিনাই, উড়তে উড়তে আমরা তো সিরিয়ার আকাশে চলে আসছি।’

পর্দায় বেজে উঠলো সেই একই রকম হো হো হাসি।

এমন টিভি সেগমেন্ট ক্ষতি কিভাবে করলো? সিরিয়ার দিনরাত বোমা-বর্ষণের ব্যাপারটাকে আরও অনেক হাস্যকর ও লেইম মোমেন্টের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হল কৌশলে।

এতে পপুলার শো এসএনএলের দর্শকদের মনে সূক্ষ্যভাবে হলেও সিরিয়া প্রসঙ্গে একটা চটুল মনভাব তৈরি হবে।

অথবা অনেক সচেতন লোকও ভাববে যে বিষয়টা সিরিয়াস, কিন্তু ফানের মাধ্যমে আমরা তো ব্যাপারটার বেদনা থেকে মুক্তি পেতে পারি।

এখানেই আছে সেই অন্ধকার কুপ, যাতে পাবলিক তার অপিনিয়ন সহই স্বেচ্ছায় ঝাপ মারে। অনেক বিষয়ই ফানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সত্যিকার ফানে পরিণত হয়।

মানে ভারি বিষয়কেও জনগণ আর ভারি হিসেবে দেখতে পারেনা।

ক্ষমতা কাঠামো তার কাজ করে যায়, আর জনগণ হাসি-ঠাট্টার মধ্যে বেঁচে থাকা শিখতে শিখতে হাবলা হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশেও এমন অনেক সিরিয়াস ব্যাপার ফানি হয়ে উঠবার উদাহরণ আছে। খুঁজলেই পাবেন।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে রিজেন্ট হাসপাতালের সিইও সাহেদের ব্যাপারটা খেয়াল করা যেতে পারে।

সাহেদের বিরুদ্ধে বড় বড় সব দুর্নীতির পাশাপাশি ভয়ঙ্কর অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ধরণের মানুষের প্রতি যদি সমাজে ঘৃণা তৈরি হয়, তা ভাল।

এমনকি সাহেদের মত যারা আছে আরও, তাদের বিপক্ষে জনমত তৈরিতে সাহেদের ঘটনাটি খুব কাজে দিতে পারত। ক্ষমতা কাঠামোয় গলাগলি মিশে এমন অপরাধ তাকে কেন করতে দেওয়া হত, এসব নিয়ে প্রতিবাদ হতে পারত।

তা কিন্তু হয়নি। ফেসবুক সেলেব্রিটি, জনপ্রিয় কিছু পেজ সাহেদকে করে তুললো জোকার।

ধীরে ধীরে সব ধরণের জনগণ সাহেদের টিভি টকশো নিয়ে মজা করল।

ফেস অ্যাাপের সাহায্যে সাহেদকে মেয়ে বানিয়ে দেওয়া হল। সে মোটা, ভোলাভালা, তাকে ধরে লাভ নেই। তারচেয়েও বড় বড় চোরেরা সাহেদের কাঁধে ভর করে পালিয়ে যায়।

সাহেদকে নিয়ে সবচেয়ে ভাইরাল পোস্টগুলোই হল ফানি পোস্ট। তার রোমহর্ষক সব ক্রাইম নিয়ে দেখা গেল কারও আর মাথা ব্যাথা নেই।

এই প্রক্রিয়ার চুড়ান্ত দৃশ্যটি মঞ্চায়িত হয়েছে তাকে আটক করার হিউমারাস ঘটনাটির মাধ্যমে।

বোরকা পরে সাহেদ পালাচ্ছিল মহিলা সেজে। পায়ে সোনার নকশা করা ভেলভেটের পাদুকা। র‍্যাব তাকে আটক করে আবার কোমরের বেল্টে একটা বন্দুকও ঝুলিয়ে দিল।

সাহেদের অপরাধের চেয়ে তাকে নিয়ে সমস্ত পাবলিক অপিনিয়নের ফোকাসই চলে গেল কৌতুকের দিকে, হাস্যরসের দিকে।

এরচেয়ে স্ট্রং, বিশ্বাসযোগ্য ড্রামা রচনার ক্ষমতাও কি রাষ্ট্র এবং মিডিয়ার নাই বলে আপনার ধারণা?

কিন্তু দেখেন, অমন স্টোরির কারণেই সাহেদ আর আপনার চোখে ক্রাইমের লিস্টি গলায় ঝুলিয়ে বসে নেই। সে আপনার চোখে এখন একজন ভাঁড়।

মিডিয়াতেও তার ফলোআপ দেখবেন ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।

আপনি যা করেন তা নিজের ইচ্ছায় করেন – এমনটাই মূলত আপনাকে বিশ্বাস করতে দেওয়া হয়। এটা বিগ গেম।

যখন আপনি চিন্তা করাকে গুরুত্ব দেন না, প্রতি মুহূর্তেই অন্য কারও হাতে ম্যানিপুলেটেড হওয়াটাই আপনার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ।

মন্তব্য জানাতে আপনার সোশাল মিডিয়া একাউন্ট অথবা ইমেল ব্যবহার করুন

error: লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন